আগামী ১ আগস্ট থেকে ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক বসাতে যাচ্ছেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প—এমন ঘোষণা দিয়েছেন তিনি নিজেই। ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ভারত বিশ্বে অন্যতম উচ্চ শুল্ক আরোপকারী দেশ এবং বাণিজ্যে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনার বিষয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থার হুমকি দিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে ভারতের গয়না, জেনেরিক ওষুধ, ইলেকট্রনিকস, অটো পার্টস ও টেক্সটাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাতগুলো বড় ধাক্কার মুখে পড়বে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদারে ভারত গত কয়েক বছর ধরে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হোয়াইট হাউস সফরের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মাত্রা পায়। কিন্তু ট্রাম্পের এই ঘোষণায় সেই কৌশলগত অগ্রগতিতে বড় বাধা তৈরি হলো বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে ভিয়েতনামের পণ্যে ২০%, ইন্দোনেশিয়ার ওপর ১৯% ও জাপানের ওপর ১৫% শুল্ক আরোপ করেছে। ফলে তুলনামূলকভাবে ভারতের ওপর চাপ আরও বাড়বে।
ব্লুমবার্গের তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ১২৯.২ বিলিয়ন ডলার। ২৫% শুল্ক কার্যকর হলে ভারতের মোট রপ্তানির অন্তত ১০% ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
রত্ন ও গয়না শিল্প
ভারতের এই খাত থেকে প্রতি বছর ১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। শুল্ক বৃদ্ধির ফলে পুরো সরবরাহ শৃঙ্খলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে, হাজার হাজার শ্রমিকের চাকরি হুমকিতে পড়বে বলে আশঙ্কা করছে ভারতীয় রত্ন ও গয়না রপ্তানিকারক পর্ষদ।
ওষুধ শিল্প
ভারত যুক্তরাষ্ট্রে সবচেয়ে বেশি জেনেরিক ওষুধ সরবরাহ করে। সান ফার্মা, ড. রেড্ডিজ ও সিপলার মতো কোম্পানিগুলোর আয়ের ৩০% এর বেশি আসে মার্কিন বাজার থেকে। ২০২২ সালে শুধুমাত্র ভারতীয় ওষুধ ব্যবহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রে ২২০ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় হয়েছিল। এই খাতেও বড় ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে।
টেক্সটাইল ও পোশাক
ভারতের তৈরি পোশাক ও হোম ফ্যাব্রিক পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের রিটেইল জায়ান্ট যেমন ওয়ালমার্ট, গ্যাপ ও কস্টকোতে রপ্তানি হয়। কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান টেক্সটাইল ইন্ডাস্ট্রি জানিয়েছে, উচ্চ শুল্কের কারণে ভারত প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে। ইতিমধ্যে অনেক প্রতিষ্ঠান মার্কিন বাজারে অর্ডার কম পাওয়ার কথা জানাচ্ছে।
ইলেকট্রনিকস
অ্যাপল তাদের কিছু আইফোন ভারতে তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি করছিল। কিন্তু শুল্ক ২৫% হলে সেই রপ্তানি অকার্যকর হয়ে পড়বে এবং অ্যাপলকে উৎপাদন পরিকল্পনা পুনর্বিবেচনা করতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
পরিশোধন ও জ্বালানি খাত
রিলায়েন্স, ইন্ডিয়ান অয়েল ও ভারত পেট্রোলিয়ামের মতো প্রতিষ্ঠান মূলত রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল কিনে পরিশোধন করে মুনাফা করছে। রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বাড়লে বা তেল আমদানি বাধাগ্রস্ত হলে এসব কোম্পানির লাভজনকতা কমে যেতে পারে।
ভারতের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছে। আগামী অক্টোবর নাগাদ এই চুক্তি সই হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তবে তার আগ পর্যন্ত ট্রাম্পের ঘোষিত ২৫ শতাংশ শুল্ক প্রযোজ্য থাকবে।
বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্য নীতিতে এমন হঠাৎ পরিবর্তন শুধু ভারতের জন্য নয়, বৈশ্বিক বাজারের জন্যও অনিশ্চয়তা তৈরি করবে।
