বাংলার জনপদে একটি কথ্যপ্রবাদ চালু আছে-'খায় জামাল্যা, মোটা হয় কামাল্যা।' অর্থাৎ যে পরিশ্রম করে, সে ফল পায় না; আর যে পরিশ্রম করে না, সে ফল ছিনাইয়া লয়। তবে এই কথাটির অন্য একটি অর্থও রহিয়াছে-অপরাধ করিবে জামাল, আর শাস্তি দেওয়া হইবে কামালকে। ইতিহাস, রাষ্ট্রনীতি এবং সমাজবিজ্ঞান ঘাঁটিলে আমরা এমন বহু কাহিনি পাই, যেইখানে একজনের কৃতকর্মের বোঝা বহন করিতে হয় তাহার চারপাশের নিরীহ লোকদের।
উনবিংশ শতকের শেষভাগে ব্রিটিশ ভারতে, পাঞ্জাব অঞ্চলের এক গ্রামে একজন তরুণ বিপ্লবী এক ইংরেজ অফিসারকে হত্যা করিয়া তাহার গ্রামে আত্মগোপন করিলে, সমগ্র গ্রামবাসীকে 'বিদ্রোহে সহায়তাকারী' বলিয়া দগ্ধ করা হয়। নারী, শিশু, পঙ্গু বৃদ্ধ-কাহারও প্রতি করুণা দেখায় নাই ব্রিটিশ বাহিনী। ইতিহাস এই নৃশংসতাকে 'শাস্তি' বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছে, অথচ তাহা ছিল এক প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিহিংসা। এই ধরনের ঘটনা কেবল ঔপনিবেশিক শাসনেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ১৯৬৫ সালে আমেরিকার সেলমা শহরে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সহায়ক এক শ্বেতাঙ্গ ধর্মযাজক-রেভারেন্ড জেমস রেব-তাহার মানবিক অবস্থানের কারণে উগ্র শ্বেতাঙ্গবাদীদের হাতে নিহত হন। তিনি অপরাধ করেন নাই, অপরাধ ছিল-তিনি বর্ণবাদকে ঘৃণ্য মনে করিয়াছেন। ড. মার্টিন লুথার কিং বলিয়াছিলেন, 'তিনি কৃষ্ণাঙ্গদের পক্ষ নহে, মানবতার পক্ষ লইয়াছেন।'
বস্তুত, প্রাচীন সভ্যতায় 'সহদোষী' বলিয়া এক ধারণা ছিল; অর্থাৎ অপরাধীর সহচর ও অপরাধে লিপ্ত, ইহা অনুমান করিয়া তাহাকেও শাস্তি দিবার বিধান ছিল; কিন্তু আধুনিক ন্যায়বিচারবোধ বলিয়া দেয়-প্রত্যেক ব্যক্তিকেই তাহার নিজ কৃত্যের দায়ে বিবেচনা করিতে হইবে। অন্যের অপরাধে দায়ারোপ বা শাস্তি প্রদান একরূপ বিচারবহির্ভূত প্রতিহিংসা। সুতরাং, একজনের মতাদর্শ, কিংবা কৃতকর্মের দায় যদি তাহার পরিচিত জন, সহচর বা গোত্রভুক্ত নিরীহদের উপর বর্তায়, তাহা হইলে সেই সমাজ ন্যায়ভিত্তিক নহে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর, জার্মানিতে এক নূতন প্রজন্মের উপর অপবাদ চাপাইয়া দেওয়া হয় যে, 'তোমাদের পূর্বপুরুষ হিটলারকে নির্বাচিত করিয়াছিলে, তাই তোমরাও দোষী'- এই মর্মে বহু আন্তর্জাতিক সামাজিক ও রাজনৈতিক মঞ্চে জার্মান তরুণদের মানসিকভাবে অপদস্থ করা হইত। আবার তাহার পূর্বে এই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ইহুদি জাতিগোষ্ঠীর প্রতি নাৎসি জার্মানির। এমনকি এই আধুনিক সময়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও গুটিকয়েক চরমপন্থির অপরাধে গোটা সম্প্রদায়কে অপরাধীর চোখে দেখা হয়। এই একই সূত্রে বর্তমানে অনেক দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর চাপাইয়া দেওয়া হয় জাতিগত অপরাধের দায়। রাজনৈতিক সহচরদের অপরাধে কখনো সাধারণ কর্মীদের, কখনো নিরপরাধ নাগরিকদের পল্লিতে গিয়া দমনপীড়ন ও হামলা করা হইয়াছে।
বিজ্ঞান যেমন বলে, দূর অতীতের কোনো পূর্বপুরুষের ভয়ংকর কোনো স্মৃতি আমাদের ডিএনএ-তে জমা থাকে এবং তাহা অকারণেই হঠাৎ কখনো আমাদের মাঝে ফিরিয়া আসিতে পারে, তেমনি অতীতের অন্যায়বিচারের অভ্যাসও আমাদের মধ্যে সুপ্ত থাকে; কিন্তু ইহা মনে রাখা আবশ্যক-ন্যায়বিচার কাহারও প্রতিশোধ নহে, কাহারও ভয়ে দণ্ডদানও নহে। ইহা এক নীরব, নীতিনিষ্ঠ, পরিমিতির সংকেত। যে সমাজ ন্যায়পরায়ণ হইতে চায়, তাহাকে প্রথমেই শিখিতে হইবে-অপরাধ ব্যক্তি করে; জাতি, ধর্ম বা সম্প্রদায় নহে। যেই সমাজে 'জামাল খায়, কামাল মোটা হয়'-সেইখানে মোটা হইয়াও কামাল নিরাপদ নহে। কারণ যেই সমাজ অন্যায় দায় অন্যের ঘাড়ে চাপায়, সেই সমাজ একদিন মোটা কামালকেও বলিবে-তুমি নীরব ছিলা, অতএব তুমিও দোষী। আমরা যেইখানে মানবাধিকারের কথা বলি, গণতন্ত্র ও সুবিচারের স্বপ্ন দেখি, সেইখানে এই প্রাচীন ভ্রান্তি-'অন্যের অপরাধে সকলকে দণ্ড'-রহিয়া গেলে আমরা কেবল অতীতের অন্ধকারেই ফিরিয়া যাইব।
