সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়

পারিশ্রমিকের ৩৪ লাখ টাকা পাওনা রেখেই সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ছাড়েন ডলি জহুর

আপডেট : ০১ আগস্ট ২০২৫, ১৪:২০

দেশের বরেণ্য অভিনেত্রী ডলি জহুর। মঞ্চ থেকে শুরু করে টেলিভিশন, চলচ্চিত্র- প্রতিটি জায়গায় সমান পদচারণা এবং দর্শকপ্রিয়তা তার। বিশেষ করে নব্বইয়ের দশকের সিনেমায় নায়ক-নায়িকাদের মায়ের চরিত্রে ডলি জহুর ছিলেন অনেকটা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রায় দেড় শতাধিক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন এ গুণী অভিনেত্রী। একাধিকবার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

হুমায়ূন আহমেদের গল্পে মোস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত ‘শঙ্খনীল কারাগার’ সিনেমায় দুর্দান্ত অভিনয়ের জন্য তিনি প্রথমবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান। পরবর্তীতে চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পান ‘একুশে পদক’। অভিনেত্রী ডলি জহুরের স্বামীও একজন অভিনেতা ছিলেন। কিন্তু বহুদিন হলো তিনি আর এই দুনিয়াতে নেই। একমাত্র ছেলে তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে অষ্ট্রেলিয়া প্রবাসী। শুধুমাত্র দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি এবং অভিনয়ের প্রতি পরম ভালোলাগা ভালোবাসার কারণেই ডলি জহুর দেশে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

বয়সের কারণে এখন কমিয়ে দিয়েছেন কাজ। মাঝেমধ্যে ছোট পর্দায় দেখা গেলেও সিনেমায় একেবারেই দেখা যায় না তাকে। এক দশকের বেশি সময় আগে সিনেমা থেকে সরে আসা এই অভিনেত্রী জানালেন আক্ষেপের কথা। অনেক সিনেমায় তাকে ঠিকমতো দেওয়া হতো না পারিশ্রমিক! পরিচালকদের কাছে এখনো পাওনা রয়েছে ৩৪ লাখ টাকা।

বুধবার (৩০ জুলাই) বিকেলে উত্তরার নিজ বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন ডলি জহুর। অভিনয় জীবনের দীর্ঘদিনের পথচলায় এবারই প্রথম গণমাধ্যমের (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া) কিছু নিমন্ত্রিত সাংবাদিকদের সঙ্গে গল্প আড্ডায় সময় কাটিয়েছেন ডলি জহুর। অভিনেত্রীর ভাষ্যে, ‌‘এমন প্রাণবন্ত মনখোলা আড্ডা আরো আগেই দেয়ার দরকার ছিলো। কিন্তু সবমিলিয়ে কখনো ভাবা হয়নাই যে এভাবেও একটা চমৎকার মার্জিত আড্ডা হতে পারে সাংবাদিকদের সঙ্গে।’

ডলি জহুর। ছবি: ইত্তেফাক  

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডলি জহুর তার দীর্ঘ অভিনয় জীবনের সহ-অভিনেতা ও নির্মাতা বিশেষ করে নায়করাজ রাজ্জাক, বুলবুল আহমেদ, গোলাম মোস্তফা, আবুল খায়ের, আবুল হায়াত, নায়ক মান্না, নায়ক সালমান শাহ, নায়িকা শাবনূরের সঙ্গে কাটানো মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণ করেন।

সে সময় তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন সিনেমার বকেয়া পারিশ্রমিক নিয়ে। ডলি জহুর বলেন, ‘আমরা যারা মা-খালা চরিত্রে অভিনয় করি, কোনো মর্যাদা ইন্ডাস্ট্রিতে পাইনি, এটা সত্যি কথা। মায়ের অভিনয় করতাম, টাকা কম পেতাম। প্রায়ই সময়মতো পারিশ্রমিক পেতাম না। আমাকে সারা জীবন শুনতে হয়েছে, আপনি টাকার জন্য কাজ করেন নাকি? টাকার জন্য নাকি কাজ করি না! ২০১১ সালে যখন আমি সিনেমা ইন্ডাস্ট্রি ছেড়ে আসি, তখন আমি পারিশ্রমিকের ৩৪ লাখ টাকা রেখে এসেছি।’

ডলি জহুরের স্বামী যখন ক্যানসারে আক্রান্ত, সেই সময়েও পরিচালকদের কাছ থেকে নিজের পাওনা টাকা পাননি তিনি। সেই সময়টাতে অনেক চেষ্টা করেছিলেন পাওনা টাকা তোলার। কিন্তু কেউ টাকা পরিশোধ করেননি। ডলি জহুর বলেন, ‘আমি অনেক সিনেমা করেছি। অনেকের কাছে টাকা পেতাম। এমনও হয়েছে, সিনেমা মুক্তি পেয়েছে, কিন্তু আমার পুরো টাকাই বকেয়া রয়ে গেছে। স্বামীর অসুস্থতার সময় এক পরিচালককে কাঁদতে কাঁদতে বলেছি, ‘কিছু টাকা আমার তুলে দেন, আমার স্বামীকে নিয়ে ব্যাংককে যাব।’ আমার পাওনা টাকা, যাকে দায়িত্ব দিলাম, তার কাছেও টাকা পেতাম। এরপর ওই লোক তো আর যোগাযোগও করেননি, নিজেও কোনো টাকা দেননি। অন্য কেউও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত দেয়নি। এমন দুঃসময়ে ইন্ডাস্ট্রি থেকে এক টাকাও পাইনি।’

আক্ষেপ করে ডলি জহুর জানান, যাদের কাছে তিনি টাকা পেতেন, তাদের মধ্যে কেউ কেউ বেঁচে নেই, আবার কেউ কেউ খুবই অসুস্থ। তাই এই টাকার আশা ছেড়ে দিয়েছেন ডলি জহুর। তাদের নাম প্রকাশ করে অসম্মানও করেননি কখনো।

অভিনেত্রী ডলি জহুরের সঙ্গে আড্ডা শেষে বিনোদন সাংবাদিকদের একাংশ। ছবি: ইত্তেফাক

অভিনেত্রী আরও বলেন, ‘ধর্মীয়ভাবে আমরা যখন অসহায় হয়ে পড়ি, তখন সব একজনের ওপর ছেড়ে দেই। তখন আমি উপরওয়ালার ওপরেই ছেড়ে দিয়েছিলাম। এটা যেহেতু আমার হকের টাকা, তাহলে এটার একটা বিচার একদিন হবেই। আর আমি কখনো হতাশ হই না। আমার অন্যের কষ্টে যতটা কষ্ট লাগে, নিজের ব্যাপারে অতটা কষ্ট লাগে না বা প্রকাশ করি না।’

বিনোদন সাংবাদিক অভি মঈনুদ্দীনের উদ্যোগে এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক সংবাদ প্রতিদিনের সম্পাদক রিমন মাহফুজ, দৈনিক খবরের কাগজের ফিচার এডিটর খালেদ আহমেদ, দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র সাব-এডিটর শৈবাল আদিত্য, দৈনিক সমকালের এমদাদুল হক মিল্টন, দৈনিক মানবকন্ঠের অচিন্ত্য চয়ন, দৈনিক আমার দেশের আফসানা আশা, দৈনিক খোলা কাগজের ওয়ালিয়ার রহমান, চ্যানেল টুয়েন্টিফোর-এর মাকসুদুল হক ইমু, স্টার নিউজ-এর মাজহারুল ইসলাম তামিম’সহ আরো বেশ কয়েকজন।

উল্লেখ্য, ডলি জহুর এরইমধ্যে গত ২৯ জুলাই এসআর মজুমদারের পরিচালনায় একটি নাটকের কাজ শেষ করেছেন।

ইত্তেফাক/এসএ