অভ্যুত্থানের ফসল এনসিপি

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৫, ১৮:১১

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের উত্তাল ঢেউয়ের পর, এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে রাজনৈতিক রাজনৈতিক দল হিসেবে যাত্রা শুরু করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি 'নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের' প্রত্যয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের হাত ধরে যাত্রার শুরুতে দেশ জুড়ে আলোড়ন তুলেছিল দলটি। দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী দুঃশাসনের কারণে আত্মপ্রকাশের পরেই তারুণ্যের প্রত্যাশায়, রাজনৈতিক সংস্কারের দাবিতে ফ্যাসিবাদবিরোধী লড়াইয়ের রূপরেখায় এক নতুন সম্ভাবনার নাম হয়ে ওঠে এনসিপি। যদিও দলটি ইতিমধ্যে রাষ্ট্রসংস্কার ও রাজনীতির নানামুখী নতুন বন্দোবস্তের বার্তা দিয়েছে, নতুন বাংলাদেশের ইশতেহার ঘোষণা করেছে।

বহুদলীয় রাজনীতিতে 'তৃতীয় শক্তি' হিসেবে একটি বিকল্প শক্তির আবির্ভাব নিয়ে বহুদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিকল্প খোঁজার যে চেষ্টা নাগরিক সমাজ, বুদ্ধিজীবী এবং তরুণদের মধ্যে কয়েক দশক ধরেই চলছিল, এনসিপি সেই প্রত্যাশাকে ধারণ করেই আবির্ভূত হবে বলে আশা ছিল জনসাধারণের। কিন্তু আত্মপ্রকাশের পর বিগত সময়গুলোতে দলটির রাজনৈতিক দর্শন, নৈতিকতা এবং সাংগঠনিক পরিপক্কতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এনসিপির নেতাদের বিরুদ্ধে উঠে আসা একের পর এক অভিযোগ দলটির ইমেজ সংকটের সবচেয়ে বড় কারণ। দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে একাধিক তদবির বাণিজ্য, বদলি বাণিজ্য, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, নারী কেলেঙ্কারিসহ নানা অভিযোগ রাজনৈতিক অঙ্গনসহ দেশের সর্বত্রই ব্যাপক আলোচিত হচ্ছে। দলের অভ্যন্তরে সমন্বয়হীনতা ও অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগ নতুন নয়। আত্মপ্রকাশের পর থেকেই এনসিপি নানা বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছে, যা জনআস্থা হ্রাসে বড় ভূমিকা রেখেছে। তরুণদের প্রত্যাশা নিয়ে গড়ে ওঠা দলটি এখন হতাশার প্রতীক হয়ে দাঁড়াচ্ছে বলে মন্তব্য করছেন রাজনীতি সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে নানা ইস্যুতে এনসিপির নেতাদের মধ্যে বিভক্তিও লক্ষণীয়। একদল মধ্যপন্থি ও র‍্যাডিকাল অবস্থান নিতে চায়, অন্যরা প্রগতিশীলতার নামে উগ্রতার পথে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধানের মূল চেতনার বিরুদ্ধে কিছু নেতিবাচক মন্তব্যও দলের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, দলে কিছু বিত্তশালী ও সুযোগসন্ধানী ব্যক্তির উপস্থিতি রয়েছে, যারা জুলাই আন্দোলনের মূল চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নন। এই কারণেই এনসিপি এখনই জাতীয় বিকল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি।

অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকাণ্ডে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে কেন্দ্র করে স্পষ্ট পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের
শীর্ষ নেতারা ও বিশ্লেষকরা। ফ্যাসিবাদের পতনের পরও সরকারের এমন আচরণকে ঘিরে প্রশ্ন উঠছে রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও সমতাভিত্তিক আচরণ নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের নেতারাই কি নতুন বাংলাদেশে নতুন করে বৈষম্যের জন্ম দিচ্ছে? গত ২৩ জুলাই প্রধান উপদেষ্টার ডাকে আয়োজিত এক বৈঠকে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক নেতারা এ বিষয়ে সরাসরি তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করেন। গত ৩০ জুন 'দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা' শুরু করেছিল এনসিপি। এনসিপির আত্মপ্রকাশের শুরু থেকেই ঢাকাকেন্দ্রিক ও টিএসসিভিত্তিক রাজনীতির অভিযোগ থাকলেও, এই পদযাত্রার মাধ্যমে দলটি জাতীয় রাজনীতিতে জায়গা করে নিতে চেয়েছে। কিন্তু বিতর্ক ও প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থান তাদের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।

মাসব্যাপী এই কর্মসূচিতে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতারা দেশের ৬৪টি জেলায় সফর করে শহিদ পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ, কবর জিয়ারত, সভা-সমাবেশ ও গণসংযোগে অংশ নেন। আত্মপ্রকাশের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় এমন বৃহৎ কর্মসূচি গ্রহণ করাকে অনেকেই সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন। তবে পদযাত্রার মাধ্যমে সংগঠনটির জনপ্রিয়তা বাড়লেও বিতর্ক এড়িয়ে যেতে পারেনি তারা। অভিযোগ রয়েছে, স সরকারি নিরাপত্তা ও প্রটোকলের সহায়তায় বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করা হয়েছে, রাস্তা বন্ধ করে সভার আয়োজন করা হয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে জোর করে শিক্ষার্থীদের সমাবেশস্থলে আনা হয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে শহিদ মিনার থেকে নতুন বাংলাদেশের ইশতেহারে সেকেন্ড রিপাবলিক ও নতুন সংবিধান প্রণয়নসহ ২৪ দফা প্রস্তাব দিয়েছে দলটি। দীর্ঘদিনের অপশাসনে রাষ্ট্রের ঘুণেধরা অংশগুলো সংস্কারের বাস্তব সমাধান এই ইশতেহারে আছে, এমনটা মনে করে নতুন করে আশায় বুক বাঁধছে দেশের হাজারো তরুণ প্রাণ। বাংলাদেশের তরুণ সমাজের প্রত্যাশা শুধু নতুন মুখের নয়, বরং নতুন ধরনের ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃত পরিবর্তন। তাই তাদের কেবল স্লোগান বা কথার নতুন মোড়কে মুগ্ধ করা সম্ভব নয়; তরুণদের মন জয় করতে হলে প্রয়োজন বাস্তব ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ।

একটি জরিপে দেখা গেছে, ১৮ থেকে ৩০ বছর বয়সি তরুণদের অধিকাংশই রাজনীতিতে আস্থা রাখেন, কিন্তু নির্দিষ্ট কোনো দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তাদের দাবি, রাজনীতি হওয়া উচিত জনগণের সেবায় নিবেদিত, ক্ষমতার জন্য নয়। যদিও তরুণরা রাজনৈতিকভাবে অসন্তুষ্ট, কিন্তু রাজনৈতিকভাবেই তারা পরিবর্তন চায়। এই তরুণদের প্রত্যাশাকে যদি এনসিপি প্রাপ্তি হিসেবে তাদের উপহার দিতে পারে, তাহলেই তারুণ্যের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি এক সুতোয় মিলবে। এনসিপি সেই পরিবর্তনের বাহক হতে পারে, যদি তারা সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হয়, আদর্শিকভাবে সুস্পষ্ট হয় এবং তরুণদের সত্যিকারের অংশীদার করে।

ইত্তেফাক/এএম

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন