২০২৪ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আরেকটি ২বড় বাঁক ঘুরে যায়। কেন্দ্রীয়ভাবে ঢাকায় শুরু হলেও চট্টগ্রাম নগরীতে এই আন্দোলন রূপ নেয় এক বিস্ফোরক গণঅভ্যুত্থানে। কোটাবিরোধী আন্দোলনের আবরণে সংঘটিত এই গণবিস্ফোরণ অচিরেই রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের মুখোমুখি হয়ে ওঠে, যার পরিণতিতে চট্টগ্রামেও ঘটে শতাধিক হতাহতের মর্মান্তিক ঘটনা। কিন্তু তীব্র দমন-পীড়ন, প্রাণহানি ও বিভ্রান্তি ছাপিয়েও আন্দোলনের জয়গাথা রচনা করে ছাত্র-জনতা, যাদের সংগ্রামের হাত ধরে শেখ হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অবসান ঘটে।
চট্টগ্রামের আন্দোলনের সূচনা ঘটে ৩ জুলাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে। সরকারের ঘোষিত মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্বহালের বিরুদ্ধে তারা শান্তিপূর্ণ অবরোধ গড়ে তোলেন চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়কে। শিক্ষার্থীদের মূল দাবি ছিল মেধাভিত্তিক নিয়োগপদ্ধতির পূর্ণ পুনর্বহাল এবং কোটা সংস্কারের মাধ্যমে বৈষম্যহীন নিয়োগ নিশ্চিতকরণ। শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে চাকরি প্রাপ্তির দাবি জানিয়ে আন্দোলনের নৈতিক ভিত মজবুত করেন।
১০ জুলাই থেকে চট্টগ্রামে আন্দোলন তীব্র হতে থাকে। শিক্ষার্থীরা দেওয়ানহাটে রেললাইন অবরোধ করে পর্যটক এক্সপ্রেসসহ একাধিক ট্রেন আটকে দেয়। টাইগার পাস মোড়ে বিক্ষোভকরে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক অচল করে তোলে। একই দিন চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে মুক্তিযোদ্ধা কোটার পক্ষে এক পালটা সমাবেশে কোটাবিরোধীদের পাকিস্তানি ভাবধারার উত্তরসূরি বলে আখ্যা দেওয়া হয়। এই বিভাজন ধীরে ধীরে সংঘর্ষের দিকে গড়াতে থাকে।
১১ জুলাই নগরীতে পুলিশের লাঠিচার্জের পর শিক্ষার্থীরা রাতভর সড়কে অবস্থান করার ঘোষণা দেয়। টাইগার পাস মোড়ে তাদের শান্তিপূর্ণ অবস্থানকে ঘিরে আবারও পুলিশের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি হয়। আন্দোলনকারীদের নেতা রাসেল আহমেদ ঘোষণা দেন, হামলা বা দমন যতই হোক, তারা আমরণ এই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।
১৬ জুলাই আন্দোলনের ইতিহাসে এক কলঙ্কময় দিন। মুরাদপুর এলাকায় শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা গুলি ও ককটেল হামলা চালায়। এতে তিন জন নিহত হয়, আহত হয় অর্ধশতাধিক। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় জানা যায়, পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিল, বরং হামলাকারীদের আশ্রয় দিচ্ছিল। আগের দিন গভীর রাতে ছাত্রদলের নেতা ওয়াসিম আকরাম নিজের ফেসবুকে শহিদ হওয়ার বার্তা দিয়ে বিকালে নিহত হন। তার মৃত্যুর পর আন্দোলনের প্রতীক হয়ে ওঠে 'শহিদ ওয়াসিম' নামটি।
এই ঘটনার পর শহরে সড়ক অবরোধ, গায়েবানা জানাজা, মিছিল ও আরো বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ১৮ জুলাই বহদ্দারহাটে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও শিক্ষার্থীদের ত্রিমুখী সংঘর্ষে আরো দুজন প্রাণ হারায়, গুলিবিদ্ধ হয় সাত জন। আহত হয় অর্ধশতাধিক। এই দিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আবাসিক হল সিলগালা করে দেয় প্রশাসন। এতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী দুর্ভোগে পড়েন, বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা।
১৯ জুলাই নগর আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আন্দোলনকারীদের ইটপাটকেল ছোড়ার ঘটনায় ছাত্রলীগ পালটা ককটেল হামলা চালায় বিএনপির কার্যালয়ের সামনে। এরপর শহরে ছড়িয়ে পড়ে সংঘর্ষ, আতঙ্ক ও অবরোধ। পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পালটা ধাওয়া চলতে থাকে। বিএনপির ২৬০ জন নেতাকর্মী গ্রেফতারহন, যাদের অধিকাংশেরই কোটা আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না। হেফাজতে ইসলাম এই আন্দোলনকে ন্যায্য আখ্যা দিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের আহ্বান জানায়।
আওয়ামী লীগ ও বিএনপি নেতাদের বাসভবন ও কার্যালয়ে হামলার মধ্য দিয়ে চট্টগ্রাম মহানগরীতে আন্দোলন তুঙ্গে ওঠে ৩ আগস্ট। শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, আওয়ামী লীগ দলীয় সংসদ সদস্য মো. মহিউদ্দিন বাচ্চু, সিটি মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপি নেতা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, নগর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক ডা. শাহাদাত হোসেন ও বর্তমান আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর বাসায় হামলা ও ভাঙচুর হয়। নগরীতে কয়েকটি পুলিশ বক্স এবং ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরাও ভেঙে ফেলা হয়।
চট্টগ্রামে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নামধারী সন্ত্রাসীরা বর্বরোচিত হামলা চালায় ৪ আগস্ট। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা নগরীর নিউ মার্কেট মোড়ে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় সিটি কলেজ ও ইসলামীয়া কলেজের ছাত্রলীগের একদল নেতাকর্মী একাধিক ককটেল বিস্ফোরণ ও গুলিছুড়ে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। গুলি, কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ডগ্রেনেডের আঘাতে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহতদের চমেক হাসপাতাল ও চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
৫ আগস্ট সকাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগ নিয়ে নগরীতে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়। বেলা ৩টার দিকে হাসিনার দেশ ছেড়ে যাওয়ার নিশ্চিত খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উল্লাসে ফেটে পড়ে চট্টগ্রামবাসী। নগরীর আনাচ-কানাচে শুরু হয় আনন্দমিছিল। এর পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি, বেসরকারি স্থাপনা ও থানায় আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। থানা থেকে লুট করা হয় অস্ত্র।
জুলাই বিপ্লবে অসম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে চট্টগ্রামের যুবারা প্রমাণ করেছেন, রাষ্ট্রযন্ত্র যত ক্ষমতাশালী হোক, গণসচেতনতা আর সাহসিকতা থাকলে তা ভেঙে ফেলা অসম্ভব নয়। চট্টগ্রামের শিক্ষার্থীরা ভয়ভীতি, গুলি, গ্রেফতার, ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা, সব বাধা উপেক্ষা করে আন্দোলন চালিয়ে গেছেন, তা সত্যিকার অর্থেই অতুলনীয়। এই সাহসিকতাই ২০২৪ সালের বিপ্লবকে সার্থক করেছে। চট্টগ্রাম হয়ে উঠেছে একটি আত্মপ্রত্যয়ের প্রতীক।
