বাংলাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ বলায় স্টেডিয়ামে ইস্টবেঙ্গল সমর্থকদের প্রতিবাদ 

আপডেট : ০৭ আগস্ট ২০২৫, ১৪:১৭

বাংলা ভাষা ঘিরে এখন উত্তপ্ত ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন। দিল্লি পুলিশ এক চিঠিতে বাংলা ভাষাকে ‘বাংলাদেশি’ ভাষা উল্লেখ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দিল্লির পুলিশের ওই চিঠির প্রতিবাদ জানানো হয়েছে কলকাতার একটি ফুটবল ম্যাচে।

বুধবার (৬ আগস্ট) কলকাতার সল্টলেক স্টেডিয়ামে দুর্গাপুর কাপের ম্যাচে ইস্টবেঙ্গল এবং নামধারী ফুটবল ক্লাবের খেলায় ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকেরা এক বিশাল ব্যানার তুলে ধরেন। সেখানে লেখা ছিল—‘ভারত স্বাধীন করতে সেদিন পরেছিলাম ফাঁসি/মায়ের ভাষা বলছি বলে আজকে বাংলাদেশি।’

এই লেখার অর্থ দাঁড়ায়, ভারত স্বাধীন করতে আমরা ফাঁসির দড়ি গলায় নিয়েছিলাম। অথচ আজ মায়ের ভাষায় কথা বলায় আমাদের বাংলাদেশি বলা হচ্ছে। ব্যানারটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

এ ঘটনার পেছনে রয়েছে ভাষা-রাজনীতির ইস্যু, যা পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ তুলেছে, দিল্লিসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষীদের টার্গেট করা হচ্ছে। এরই মধ্যে দিল্লি পুলিশের একটি চিঠি আগুনে ঘি ঢালার কাজ করেছে। ওই চিঠিতে এক পুলিশ ইন্সপেক্টর বাংলাকে ‘বাংলাদেশি ভাষা’ আখ্যা দিয়ে তার অনুবাদক চেয়ে বঙ্গভবনের (দিল্লি পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের অতিথি ভবন) এক কর্মকর্তাকে চিঠি দেন।

কিন্তু বাস্তবে এমন কোনো ভাষা নেই, যার নাম ‘বাংলাদেশি ভাষা’। বাংলাদেশ ও ভারতে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাংলা ভাষায় কথা বলে। এই চিঠি সামনে রেখেই কেন্দ্রীয় সরকারকে আক্রমণ করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। কারণ, দিল্লি পুলিশ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে।

এক্সে এই চিঠি শেয়ার করে তৃণমূল নেত্রী ও পশ্চিমবঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লেখেন, ‘এ ধরনের শব্দচয়ন চরম লজ্জাজনক, অপমানজনক, দেশবিরোধী এবং সংবিধানবিরোধী। এটা ভারতের সব বাংলাভাষী মানুষের অপমান। এভাবে ভাষা ব্যবহার করে আমাদের হেয় করা যায় না।’

তিনি আরও লেখেন, ‘দেখুন, কীভাবে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা দিল্লি পুলিশ বাংলাকে বাংলাদেশি ভাষা হিসেবে বর্ণনা করছে!’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন আক্রমণের জবাব দিয়েছেন বিজেপির এক জ্যেষ্ঠ নেতা। তিনি বলেন, ‘তৃণমূল নেত্রীর এই বক্তব্য শুধু ভুলই নয় বরং বিপজ্জনক ও উসকানিমূলক। দিল্লি পুলিশের ওই চিঠিতে কোথাও বাংলা বা বাংলা ভাষাকে বাংলাদেশি ভাষা বলা হয়নি। সেখানে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করার প্রেক্ষিতে ভাষাটিকে বাংলাদেশি বলা হয়েছে, যেটি মূলত কিছু নির্দিষ্ট উপভাষা, বাক্যগঠন ও উচ্চারণ ভঙ্গির ভিন্নতার কথা বলছে। বাংলাদেশের অফিশিয়াল বাংলা শুধুমাত্র ধ্বনিগতভাবে আলাদা নয়, বরং এতে সিলেটির মতো উপভাষাও রয়েছে, যা অনেক ভারতীয় বাঙালির কাছে প্রায় বোঝার অযোগ্য।’

কলকাতার ফুটবল মাঠে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার ঘটনা অবশ্য নতুন নয়। ২০২০ সালের জানুয়ারিতেও জাতীয় নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকেরা একটি ব্যানার তুলেছিলেন। তাতে লেখা ছিল, ‘রক্ত দিয়ে কেনা মাটি, কাগজ দিয়ে নয়।’

ইস্টবেঙ্গল ক্লাবের জন্য এসব রাজনৈতিক বার্তা ব্যক্তিগত ইতিহাসের সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কারণ, শতবর্ষের পুরোনো এই ক্লাবের অধিকাংশ সমর্থকের শিকড় বাংলাদেশের মাটিতে। দেশভাগ ও উদ্বাস্তু জীবনের অভিজ্ঞতা এই ক্লাবের ইতিহাসে গভীর ছাপ রেখেছে।

এমনকি গত বছর আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায়ও ফুটবল মাঠে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। সেবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ইস্টবেঙ্গল ও মোহনবাগান সমর্থকেরা এক হয়ে যৌথভাবে ন্যায়বিচারের দাবি জানিয়েছিলেন।

ইত্তেফাক/জেডএইচ