বিদ্রোহী দমনে ইউরোপীয় প্রযুক্তির ড্রোন ব্যবহার করছে মিয়ানমারের জান্তা

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৫, ১২:২৯

বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সাধারণ নাগরিকদের দমনে ইউরোপীয় প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্রোন ব্যবহার করছে মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই তথ্য, যা আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জান্তার বিরুদ্ধে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানিয়েছে মানবাধিকার সংগঠনগুলো। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।

ব্রিটিশ গণমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, অস্ত্র ও সংঘাতবিষয়ক গবেষণা সংস্থা কনফ্লিক্ট আরমামেন্ট রিসার্চ (সিএআর) মিয়ানমার ইস্যুতে তাদের সর্বশেষ গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, জান্তা বাহিনী দীর্ঘদিন ধরে দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় কায়াহ রাজ্যসহ বিভিন্ন এলাকায় সশস্ত্র হামলা চালিয়ে আসছে এবং এসব হামলায় তারা অ্যান্টি জ্যামিং প্রযুক্তিসম্পন্ন সামরিক ড্রোন ব্যবহার করছে। প্রযুক্তিটি ইউরোপে উদ্ভাবিত হলেও ড্রোনগুলোর উৎপাদন হয়েছে চীনে।

সিএআরের গবেষকরা কায়াহ রাজ্যে ভূপাতিত কয়েকটি সামরিক ড্রোন পরীক্ষা করে দেখেন, সেগুলোতে উন্নত নেভিগেশন মডিউল সংযোজিত ছিল। এসব মডিউল ড্রোনকে সিগন্যাল জ্যামিং ও স্পুফিং থেকে রক্ষা করে। পশ্চিম মিয়ানমারের চীনা সীমান্তবর্তী রাজ্যেও একই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতা দখলের পর থেকে জান্তা বাহিনী ও সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠে। অনেক রাজ্যে বিদ্রোহীরা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। দ্য গার্ডিয়ান জানায়, গত এক বছরে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি ড্রোন হামলা চালিয়েছে জান্তা, এমনকি ড্রোন প্রযুক্তিতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছে তারা। আর্মড কনফ্লিক্ট লোকেশন অ্যান্ড ইভেন্ট ডাটা প্রজেক্ট-এর তথ্য অনুযায়ী, ড্রোন ব্যবহারের ক্ষেত্রে বর্তমানে বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে মিয়ানমার।

মিয়ানমার ১৯৯০-এর দশকের গোড়ার দিক থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছে। সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের ওপর সেনাবাহিনীর নির্যাতনের কারণে ২০১৮ সালে নিষেধাজ্ঞা আরও কড়াকড়ি করা হয়। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর তা আরও বিস্তৃত হয়। তবে সিএআরের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা পর্যাপ্ত বিস্তৃত নয় এবং সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে বাস্তবায়নে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিস ফর মিয়ানমার-এর মুখপাত্র ইয়াদানার মাউং বলেন, 'এই প্রতিবেদন আমার কাছে বিস্ময়কর নয়। এটি সেই ধারাবাহিকতারই অংশ যেখানে জান্তার কাছে যোগাযোগ সরঞ্জাম, স্পাইওয়্যার, ইউএভি যন্ত্রাংশ, এমনকি নৌবাহিনীর বড় যুদ্ধজাহাজের প্রপালশন সিস্টেম পর্যন্ত পৌঁছে গেছে।' তিনি জানান, জান্তার সঙ্গে ব্যবসায় জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নকে সহযোগী দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে অর্থ, অস্ত্র ও জ্বালানির প্রবাহ বন্ধ করতে হবে।

সিএআরের প্রধান গবেষক রবার্ট হান্টার পার্কিনস বলেন, 'ড্রোন যুদ্ধনীতি বিশেষ চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, কারণ প্রযুক্তিটি দ্রুত বিকাশমান। বাণিজ্যিক বাজারে এখন যে প্রযুক্তি পাওয়া যাচ্ছে, তা কয়েক বছর আগের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। শিল্পক্ষেত্রের এই উদ্ভাবনগুলোকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা কঠিন।'

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মার্চে একটি ইউরোপীয় প্রতিষ্ঠান তাদের অ্যান্টি জ্যামিং প্রযুক্তি চীনের এক পরিবেশকের কাছে সরবরাহ করে। পরে সেই পরিবেশক বড় একটি চালান চীনভিত্তিক ড্রোন সংযোজক প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে। ওই প্রতিষ্ঠান প্রযুক্তিটি ইউএভিতে একত্রিত করে ২০২৪ সালের মার্চে চীন-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রুইলিভিত্তিক এক প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে। এই রুইলি অঞ্চলটি সীমান্ত বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র।

তবে সিএআর জানায়, পরিবেশক ও সংযোজক প্রতিষ্ঠানের অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কোনো সরাসরি প্রমাণ তারা পায়নি। প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানটিও তাদের পণ্যের অপব্যবহার ঠেকাতে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ নিয়েছে।

ইত্তেফাক/টিএইচ