ছয় বছর পর আজ ড্যাবের কাউন্সিল ও নির্বাচন, হারুন-শাকিল প্যানেলের একগুচ্ছ কর্মপরিকল্পনা

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৫, ১০:১৩

বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচন আজ। 

শনিবার (০৯ আগস্ট) রাজধানীর কাকরাইলে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল অ্যান্ড কলেজে এই কাউন্সিলে সরাসরি ভোটে চিকিৎসকরা তাদের নেতা নির্বাচন করবেন। এদিন ভোটগ্রহণ শুরু হবে দুপুর ১টায়, চলবে বিকেল ৫টা পর্যন্ত।

তার আগে আজ সকাল সাড়ে ১০ টা থেকে কাকরাইল উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুল প্রাঙ্গনে ড্যাবের জাতীয় সম্মেলন শুরু হয়েছে । এতে প্রধান অতিথি থাকছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

দীর্ঘ ছয় বছর পর এ ভোট হচ্ছে। এতে দুটি প্যানেল প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। একটি প্যানেলে সভাপতি ও মহাসচিব পদে দাঁড়িয়েছেন যথাক্রমে ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক হারুন আল রশিদ ও জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক জহিরুল ইসলাম শাকিল। প্রতিদ্বন্দ্বী প্যানেলে সভাপতি ও মহাসচিব প্রার্থী যথাক্রমে শিশু হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক এ কে এম আজিজুল হক ও আনোয়ার খান মডার্ন মেডিকেল কলেজের রেসপিরেটরি বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সাকুর খান।

হারুন আল রশিদ ২০১৯ সাল থেকে ড্যাবের সর্বশেষ কমিটির নির্বাচিত সভাপতি ছিলেন। তিনি বিগত ১৫ বছর হাসিনার ফ্যাসিজম বিরোধী আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন। অধ্যাপক হারুন আল রশিদ আওয়ামীলীগের দলীয় একদেশদর্শী বৈষম্যমূলক আচরণ এবং নিবর্তনমূলক কর্মকাণ্ডের মুখেও ড‍্যাবকে সংগঠিত ও প্রতিবাদী ভূমিকায় রেখে প্রশংসিত হয়েছেন। মানবিক ও অমায়িক সংগঠন হিসেবে অধ্যাপক হারুন আল রশিদ চিকিৎসকদের মাঝে জনপ্রিয় ।

তার প‍্যানেলের প্রতিপক্ষ অধ্যাপক এ কে এম আজিজুল হক ইতিপূর্বে ১৪ বছর অর্থাৎ ২০০৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ড্যাবের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

সংশ্লিষ্টরা জানান, এবারের নির্বাচনে ড্যাবের শীর্ষ পাঁচটি পদের বিপরীতে দুটি প্যানেলের মোট ১০ জন প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এরইমধ্যে শেষ হয়েছে প্রচার প্রচারণা। ভোটের সব আয়োজনও প্রায় সম্পন্ন। 

সর্বশেষ ২০১৯ সালের ২৪ মে কাউন্সিলরদের সরাসরি ভোটে অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশীদ ড্যাব সভাপতি এবং ডা. মো. আব্দুস সালাম মহাসচিব নির্বাচিত হন। 

গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেস ক্লাবে হারুন-শাকিল প্যানেলের ইশতেহার ঘোষণা ও নির্বাচনের সার্বিক দিক নিয়ে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। 

অন্যদিকে আজিজ-শাকুর প্যানেল গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে পরিচিতি ও সংবাদ সম্মেলন করেছে। উভয় প্যানেলই নির্বাচনী ইশতেহারে ফ্যাসিবাদমুক্ত ড্যাব গড়ার প্রতিশ্রুতি দেন।

হারুন-শাকিল পরিষদের অন্য প্রার্থীরা হলেন, সিনিয়র সহসভাপতি পদে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কেনান, কোষাধ্যক্ষ পদে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিদ ডা. মেহেদী হাসান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে অর্থোপেডিক সার্জারি অধ্যাপক ডা. খালেকুজ্জামান দিপু।

আজিজ-শাকুর পরিষদের অন্য প্রার্থীরা হলেন, সিনিয়র সহসভাপতি পদে বিএমইউর অতিরিক্ত রেজিস্ট্রার ডা. সাইফ উদ্দিন নিসার আহমেদ তুষান, কোষাধক্ষ্য পদে ইউরোলজিস্ট ডা. তৌহিদ উল ইসলাম জন ও সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে বিএমইউর উপ-রেজিস্ট্রার ডা. আবু আহসান ফিরোজ।

হারুন-শাকিল পরিষদের সভাপতি প্রার্থী ডা. হারুন আল রশিদ বলেন, সম্মেলনের মাধ্যমে কমিটি করলে গণতান্ত্রিক চর্চা বিকশিত ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়। কাউন্সিলে প্রকৃত নেতাদের মূল্যায়নের সুযোগ থাকে। জয়ী এবং পরাজিত প্যানেলের লোকজন মিলেমিশে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা যায়। এই চর্চা কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে সর্বত্র অব্যাহত রাখলে দলের লাভ হবে।

আজিজ-শাকুর প্যানেলে সভাপতি প্রার্থী অধ্যাপক আজিজুল হক বলেন, বহুদিন পর একটি কাউন্সিল হতে যাচ্ছে। আমরা জয়ের ব্যাপারে শতভাগ আশাবাদী। প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিজন কান্তি সরকার বলেন, উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভোট গ্রহণ হবে।

এ উপলক্ষে পরিচিতি অনুষ্ঠানে ৩ স্তরের নির্বাচনী ইশতেহার ও কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ডা. হারুন-শাকিল নেতৃত্বাধীন প্যানেল। 

গতকাল শুক্রবার বিকেলে ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ইশতেহার ও কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেন ড্যাবের এবারে নির্বাচনে মহাসচিব প্রার্থী সদ্য সাবেক কোষাধক্ষ্য ডা. মো. জহিরুল ইসলাম শাকিল। তিনি বলেন, আমাদের প্যানেলের প্রার্থীরা প্রত্যেকেই গত ১৭ বছর খুনি হাসিনার রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে রাজপথে বিএনপির সহযোগী সংগঠন হিসেবে সক্রিয় থাকার পাশাপাশি চিকিৎসকদের বিভিন্ন দাবি আদায়ে ও পেশাগত উৎকর্ষতায় ভূমিকা পালন করেছেন। দেশ ও জনগণের প্রয়োজনে ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে, করোনা মহামারি, ডেঙ্গু প্রতিরোধে ও বন্যায় জনগণের পাশে দাঁড়িয়েছেন। সরকারবিরোধী আন্দোলন-সংগ্রামে আহতদের চিকিৎসায় রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দেশের সর্বত্র আহত রোগীদের চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রেখেছে। 

এছাড়া নিহতদের পরিবারকে বিভিন্ন সময় আর্থিকভাবে সহযোগিতা করেছেন। রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার পাশাপাশি আহত নেতাকর্মীদের চিকিৎসাসেবায় ডা. হারুন-ডা. সালাম-ডা. শাকিলের নেতৃত্বে চিকিৎসকরা সর্বদা সচেষ্ট ছিল। অনুষ্ঠানে হারুন-শাকিল প্যানেলের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

এই প্যানেলের প্রার্থীরা হলেন- সভাপতি পদে ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, মহাসচিব পদে জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. জহিরুল ইসলাম শাকিল, সিনিয়র সহসভাপতি পদে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. আবুল কেনান, কোষাধ্যক্ষ পদে ড্যাবের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিদ ডা. মো. মেহেদী হাসান, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব পদে অর্থোপেডিক সার্জারি অধ্যাপক ডা. একেএম খালেকুজ্জামান দিপু।

ডা. শাকিল তিন পর্বের নির্বাচনী ইশতেহার ও কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। প্রথম পর্বে স্বল্পমেয়াদি (১-৩ বছর) এর মধ্যে রয়েছে- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঘোষিত রাষ্ট্র মেরামতে ৩১ দফা কর্মসূচির ২৬তম ধারার আলোকে ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এবং ‘সর্বজনীন চিকিৎসা’ ব্যবস্থা কার্যকর করতে বদ্ধপরিকর। চিকিৎসক, রোগী সম্পর্ক : আস্থা ও সমঝোতার মাধ্যমে গুণগত চিকিৎসা; স্বাস্থ্যসেবা খাতে চিকিৎসক, স্বাস্থ্য কর্মীর সুরক্ষা ও রোগীর জন্য সমতা ভিত্তিক আইন প্রণয়ন ও কার্যকরী ব্যবস্থা। সরকারি চিকিৎসকদের জন্যে সুষম পদোন্নতি ও বদলি নীতিমালা, চাকরির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নীতিমালা ও বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মেডিকেল কারিকুলামসহ প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাবনা দেওয়া। চিকিৎসক, নার্স এবং অন্য স্বাস্থ্য কর্মীদের সুযোগ সৃষ্টি ও সেবার গুণগত মান উন্নয়ন। এমবিবিএস, পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন এবং নার্সিং শিক্ষা ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক মানে রূপান্তরকরণ। ইউনিয়ন সাব-সেন্টারের মানোন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ। সঠিক রেফারেল সিস্টেম বাস্তবায়ন। প্রয়োজনীয় ঔষধ নীতির সময়োপযোগী পরিবর্ধন ও কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণ। বেসরকারি স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার প্রস্তাবনা। ড্যাবের চিকিৎসকবৃন্দের একটি আধুনিক প্রযুক্তিসম্পন্ন ড্যাবের নিজস্ব স্থায়ী অফিস স্থাপন। চিকিৎসকবৃন্দের নিরাপদ কর্মস্থল এবং নিরাপদ আবাসস্থলের ব্যবস্থা করা। চিকিৎসকদের পেশাগত কাজে পারদর্শিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিদেশে পেশাগত প্রশিক্ষণ ও কারিগরী দক্ষতা আদান-প্রদানের জন্য বিদেশী চিকিৎসকদের বাংলাদেশে আইনগতভাবে বিএমডিসি’র অনুমতিক্রমে কাজ করার সীমাবদ্ধতা দূরীকরণ। ডক্টরস ওয়েলফেয়ার ফান্ড গঠন ও চিকিৎসকদের সহযোগীতা করা। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের বয়স সীমা ৩২ বৎসর থেকে ৩৪ বৎসর করা ও বেকার চিকিৎসকদের চাকরিতে নিয়োগের বিষয়ে সরকারের সাথে আলোচনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা। মধ্যমেয়াদি (১-৫ বছর) পরিকল্পনার মধ্যে আছে- স্বাস্থ্য কার্ড প্রবর্তনের প্রস্তাবনা। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অটোমেশন। 

বিগত ১৫ বছরে বঞ্চিত যোগ্যতম চিকিৎসকবৃন্দকে সরকারি ও বেসরকারি খাতে চাকরিতে নিয়োগ এর ব্যবস্থাকরণ। দীর্ঘদিন বঞ্চিত চিকিৎসকদের বয়স অতিক্রান্ত বিধায় চাকরিতে তাদেরকে নিয়োগে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ। দুর্নীতিমুক্ত চাকরির নীতিমালা ও মেধাভিত্তিক পদোন্নতির ব্যবস্থাকরণ। দীর্ঘমেয়াদি (১-১০ বছর) পরিকল্পনার মধ্যে আছে- চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনার পুনর্বিন্যাস ও স্বাস্থ্য বিমা চালুকরণ।

এছাড়াও সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ বলেন, আমরা কাউকে সদস্য পদ থেকে বাদ দিইনি। এ নিয়ে একটা বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে। যাদের সদস্যপদ বাতিল হয়েছে তারা ফ্যাসিবাদের সহযোগী। 

এ নিয়ে পরবর্তীতে ড্যাবের নির্বাচন কমিশন প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষ করেছেন। মৃত ব্যাক্তিকে সদস্য রাখার তিনি বলেন, পৃথিবীর কোনো ভোটার তালিকা কিন্তু নির্ভুল নয়। আমাদের নেতা তারেক রহমান যেভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন সেভাবেই কাউন্সিল হতে যাচ্ছে। যারা বিগত আন্দোলন সংগ্রামে রাজপথে ছিলেন তাদের মাধ্যমে ড্যাব এগিয়ে যাবে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ড্যাবের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি ডা. এমএ সেলিম, সহসভাপতি ডা. মোসাদ্দেক হোসেন বিশ্বাস ডাম্বেল, ডা. মো. সিরাজুল ইসলাম, ঢাকা মহানগর উত্তর ড্যাবের সভাপতি অধ্যাপক ডা. সরকার মাহবুব আহমেদ শামীম, ড্যাবের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. সাঈদ মেহবুব উল কাদির, ডা. আদনান মাসুদ, ডা. রাকিবুল ইসলাম আকাশ প্রমুখ।

ইত্তেফাক/পিএস