বিড়াল-কুকুর কেন ঘাস খায়, বিজ্ঞান কী বলে?

আপডেট : ০৯ আগস্ট ২০২৫, ২০:৩৬

অনেকেই হয়তো লক্ষ্য করেছেন, কুকুর বা বিড়াল মাঝে মাঝে ঘাস খায়। এটা একটা অস্বাভাবিক খাবার বলে মনে হতে পারে, বিশেষ করে বিড়ালদের জন্য, যারা মাছ-মাংস পছন্দ করে। তাহলে আমাদের পোষা প্রাণীরা ঘাস খায় কেন?

নিউ ইয়র্কের সিরাকিউসের স্ট্যাক ভেটেরিনারি হাসপাতালের একজন পশুচিকিৎসক ড. জেমি লাভজয় বলেন, এখানে বেশ কিছু তত্ত্ব আছে। আমরা কুকুর এবং বিড়াল উভয়ের মধ্যেই ঘাস খাওয়ার আচরণ দেখতে পাই, অথচ দুটি প্রজাতিরই ঘাস হজম করার তেমন সক্ষমতা নেই।

উদাহরণস্বরূপ, ঘাস খাওয়া প্রজাতির প্রাণীদের বিশেষ অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া থাকে। এটি খাওয়ার পর ঘাসের শক্ত 'সেলুলোজ' ভেঙে ফেলতে সাহায্য করে। অনেক তৃণভোজী প্রাণীর একাধিক পাকস্থলী প্রকোষ্ঠ এবং উদ্ভিদের উপাদানগুলো ভেঙে ফেলার জন্য দীর্ঘ পরিপাকতন্ত্র থাকে।

ড. জেমি লাভজয় বলেন, একটি প্রচলিত তত্ত্ব হলো, 'পোষা প্রাণী পেট খারাপের জন্য ঘাস খায়'। বেশিরভাগ সময় এটি বমি বা মলত্যাগের মাধ্যমে কিছুটা অপরিবর্তিতভাবে বেরিয়ে আসে। তাই আমি মনে করি, এটি অনেক বৃদ্ধাদের গল্পকে অনুপ্রাণিত করে।

তবে গবেষণায় দেখা গেছে, বিড়াল এবং কুকুরের ঘাস খাওয়ার পেছনের কারণ হিসেবে 'অসুস্থতা'কে কেবল মাঝে মাঝে দায়ী করা যেতে পারে।

২০০৮ সালে গবেষকরা কুকুর মালিকদের বিভিন্ন গ্রুপকে তাদের 'পোষা প্রাণীর ঘাস খাওয়ার আচরণ' সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করেছিলেন। একটি ওয়েব জরিপে ১ হাজার ৫৭১ জন মালিকের প্রতিক্রিয়ার মধ্যে - ৬৮% জানিয়েছেন, তাদের কুকুর প্রতিদিন বা সাপ্তাহিকভাবে ঘাস খেয়েছে। তবে মাত্র ৮% বলেছেন, ঘাস খাওয়ার আগে তাদের কুকুরগুলোর অসুস্থতার লক্ষণ দেখা দিয়েছে।

২০২১ সালে অ্যানিম্যালস জার্নালে প্রকাশিত বিড়াল মালিকদের দুটি অনুরূপ জরিপে দেখা গেছে, প্রথম জরিপে মাত্র ৬% এবং দ্বিতীয় জরিপে ৯% বিড়াল ঘাস খাওয়ার আগে অসুস্থ বলে মনে হয়েছিল। যদিও ২৭% এবং ৩৭% ঘাস খাওয়ার পর ঘন ঘন বমি করেছিল। দ্বিতীয় জরিপে ৭১% মালিক তাদের বিড়ালদের কমপক্ষে ছয়বার লতাপাতা খেতে দেখেছেন।

২০২১ সালের গবেষণায় এই আমাদের মাঝে ছড়িয়ে থাকা এই ধারণাটিও পরীক্ষা করা হয়েছিল যে, 'বিড়ালরা চুল বের করে দিতে ঘাস খায়'। পূর্ববর্তী গবেষণায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, লম্বা চুলের বিড়ালরা ছোট চুলের বিড়ালদের তুলনায় বেশি ঘন ঘন বমি করে। তবুও গবেষণায় দুটি দলের মধ্যে ঘাস খাওয়ার আচরণের পুনরাবৃত্তিতে 'কোন স্পষ্ট পার্থক্য' পাওয়া যায়নি।

গবেষকরা বন্য কুকুর এবং বিড়ালদের মধ্যেও ঘাস খাওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করেছেন, যা ইঙ্গিত দেয়, এটি একটি সহজাত আচরণ হতে পারে।

বিজ্ঞানীরা অনুমান করেছেন, বন্য বিড়াল এবং নেকড়েরা তাদের 'অন্ত্র' থেকে পরজীবী দূর করার জন্য ঘাস খায়। তাই সম্ভবত গৃহপালিত প্রাণীরাও একই কাজ করে।

২০০৮ সালের গবেষণার লেখকের মতে, ঘাসের 'কোনো আপাত পুষ্টিগুণ নেই'। টেক্সাস এএন্ডএম কলেজ অফ ভেটেরিনারি মেডিসিন অ্যান্ড বায়োমেডিকেল সায়েন্সেসের ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক ড. লরি টেলার বলেন, তা সত্ত্বেও কিছু বিজ্ঞানী মনে করেন, কুকুর এবং বিড়াল সম্ভবত 'ভিটামিন বি'র মতো মাইক্রোনিউট্রিয়েন্টের জন্য লতাপাতা খায়।

তবে বেশিরভাগ পোষা প্রাণী - যারা সুষম খাদ্য গ্রহণ করে, এদের ক্ষেত্রে এটি সম্ভবত প্রযোজ্য নয়, যদি না তাদের কোনো অন্তর্নিহিত স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে।

ড. লরি টেলার লাইভ সায়েন্সকে বলেন, 'যদি আপনার একটি সুস্থ পোষা প্রাণী থাকে এবং সুষম খাদ্য গ্রহণ করে এবং মাঝে মাঝে ঘাস খেতে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে চিন্তার কোনো কারণ নেই। যদি তারা এই গাছপালাগুলোর প্রতি লোভী হয়, অথবা ক্রমাগত খায়...তারপর বমি বমি করে, তাহলে অবশ্যই একটি ভেতরের সমস্যা থাকতে পারে।'

অপরদিকে, ড. জেমি লাভজয় ব্যাখ্যা করেন, তহবিলের অভাবের কারণে বিড়াল এবং কুকুরের ঘাস খাওয়ার ওপর বৈজ্ঞানিক গবেষণা তুলনামূলকভাবে খুব কম। প্রচুর ঘাস খাওয়ার ফলে পোষা প্রাণীদের খুব কমই বড় ধরনের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দেয়। তাই পশুচিকিৎসা গবেষণা আরও গুরুতর সমস্যাগুলোর চিকিৎসার ওপর দৃষ্টি দিয়ে থাকেন।

তিনি বলেন, তবে আমি মনে করি, বিড়াল-কুকুরের ঘাস খাওয়া নিয়ে এই প্রশ্নের অনেকগুলোই 'প্রযুক্তিগতভাবে উত্তরহীন'।

তবে ড. লাভজয়ের বর্তমান তত্ত্বটি হলো: 'বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই, আমাদের পোষা প্রাণীরা ঘাস খায় কারণ তারা চায় — হয়তো তারা এর স্বাদ পছন্দ করে। এছাড়াও হয়তো উদ্দীপনা চায় অথবা তাদের পরিবেশ অন্বেষণ করে।'

যদিও ঘাস খাওয়ার অভ্যাস বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্ষতিকারক নয়, তবুও পোষা প্রাণীর মালিকদের জানা উচিত, কিছু গাছপালা বিষাক্ত। ড. লাভজয় পোষা প্রাণীর জন্য বিষাক্ত উদ্ভিদের তালিকা পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। সেই সঙ্গে যদি পোষা প্রাণী ঘন ঘন বমি করে বা অস্বাভাবিক মলত্যাগ করে, টেলার পশুচিকিত্সকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

তথ্যসূত্র: লাইভ সায়েন্স

ইত্তেফাক/এসকে