বেরোবিতে আমরণ অনশনে অসুস্থ ৫ শিক্ষার্থী, ইউজিসির গায়েবানা জানাজা

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০২৫, ২০:৪৭

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ‘ছাত্র সংসদ’ সংযুক্ত করে নির্বাচনের রোড ম্যাপের দাবিতে আমরণ অনশনে ২৪ ঘণ্টায় পাঁচ শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।

সোমবার (১৮ আগস্ট) সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অনশনে অসুস্থ হয়ে পড়া শিক্ষার্থী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাহিদুল ইসলাম মাহিদ ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের জাহিদ হাসান জয়কে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। অসুস্থ অবস্থায় অনশনে রয়েছেন গণিত বিভাগের ছাত্র আরমান হোসেন, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের রুমাইনুল ইসলাম রাজ ও রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগের নয়ন মিয়া।

এদিকে রোববার রাত থেকে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে একাত্বতা প্রকাশ করে অনশন স্থলে বসে রয়েছেন, উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলীও। ছাত্র সংসদের দাবীতে রোববার রাতে বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল করেছে। অনশনস্থলে ছাত্র প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে তারা নানা শ্লোগান দিয়েছেন।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থী মাহিদুল ইসলাম বলেন, ব্যানারে লেখা হয়েছে আমরণ অনশন। এতে শারীরিক অবস্থা খারাপ থেকে খারাপতর হলেও অনশন থেকে সরে যাওয়ার সুযোগ নেই। দাবি আদায় করে তবেই এখান থেকে উঠবো। আমাদের অনশনের ব্যাপারে জরুরী মিটিং করে বা অনলাইনে মিটিং করে পদক্ষেপ নেওয়া যেত। এখন পর্যন্ত ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কোন স্বদিচ্ছা দেখতে পারছি না। আমাদের আন্দোলনের সঙ্গে ভিসি স্যার একাত্বতা প্রকাশ করে আমাদের মত না খেয়ে পড়ে আছেন। রাতে তিনি বাসায় যাননি। উনি চেষ্টা করছেন। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কোনো পদক্ষেপ আমরা দেখতে পারছি না। 

শিক্ষার্থী আশিকুর রহমান বলেন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে আমরণ অনশনে বসতে হয়েছে। এর চেয়ে লজ্জার আর কিছু হতে পারে না। আবু সাঈদের বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীর কিছু হলে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। 

শিক্ষার্থী রহমত আলী বলেন, প্রধান উপদেষ্টা সিন্ডিকেট রুমে বসে বেরোবি শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা শুনেছেন। সেই সময় আমরা দাবি করেছিলাম সারাদেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এক বছরেও প্রশাসন ছাত্র সংসদ নির্বাচন করতে পারেনি। ফলে ক্যাম্পাসে ছাত্র নেতৃত্ব তৈরি না হওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের দমন-নিপীড়ন চলে। আজ শিক্ষার্থীরা হতাশায় জীবনকে ত্যাগ করার জন্য আমরণ অনশনের মত কর্মসূচিতে গিয়েছে। আমরা সরকারকে আরেকবার মনে করিয়ে দিতে চাই, এত শহীদের রক্তের উপর দাঁড়িয়ে শিক্ষার্থীদের অনশনে তাদের ক্ষতি হলে দেশের মানুষ আপনাদের ক্ষমা করবে না। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন শুরু হবে আবু সাঈদের ক্যাম্পাসে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রোডম্যাপ ও আইনে সংযুক্ত করার মধ্য দিয়ে।


বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. শওকাত আলী বলেন, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে আমি গতকালই সংহতি প্রকাশ করেছি। সারাদিন-সারারাত এখন পর্যন্ত তাদের সঙ্গে আছি। আমার সন্তান হিসেবে শিক্ষার্থীদের ফেলে রেখে আমি কোথাও যেতে পারি না। আজকে সকাল বেলা মাননীয় উপদেষ্টার সঙ্গে কথা হয়েছে। আমাদের ইউজিসি সচিব ফোন করেছেন, শিক্ষা উপদেষ্টার পিএস ও উপদেস্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার পিএস ফোন করেছিলেন। ইউজিসির সঙ্গে কথা বলেছি, তারা আজকেই একটা মিটিংয়ের ডেট ঘোষণা করবে বলে আশ্বস্ত করেছেন। মিটিং হলে আমাদের ‘ল’ ভোটিংয়ের কাজ শেষ হবে। এটি হলে আমাদের সংবিধি মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠালে তা গেজেট হয়ে আসবে। এই কয়েকটা দিন সময় দিক। শিক্ষার্থীদের কাছে এটি আমার আবেদন।

ইউজিসির প্রতীকী গায়েবানা জানাজা

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্র সংসদ সংযুক্ত করতে উদ্যোগ না নেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে মৃত ঘোষণা করে প্রতীকী গায়েবানা জানাজা করেছে জুলাইযোদ্ধারা।

সোমবার (১৮ আগস্ট) বিকেলে শহীদ আবু সাঈদ চত্ত্বরে গায়েবানা জানাজা অনুষ্ঠিত হয়।

জানাজায় অংশ নেওয়া জুলাইযোদ্ধা ইমতিয়াজ আহমেদ ইমতি, শাহ মোতাওয়াক্কিল বিল্লাহ ফকির, নাহিদ হাসান খন্দকারসহ অন্যরা জানান, যৌক্তিক দাবীর প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসলেও ইউজিসি আমলে নেয়নি। মৃত ইউজিসি শিক্ষার্থীদের দাবী পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের গায়েবানা জানাজার নামাজ পড়া হয়েছে। অবিলম্বে দাবি মানা না হলে বেগম রোকেয়া বি্বিবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে রংপুরের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামবে।

উল্লেখ্য, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ১৬ বছর পেরিয়ে গেলেওবিশ্ববিদ্যালয় আইনে ছাত্র সংসদ যুক্ত করাসহ নির্বাচনের আয়োজন করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের দাবী, বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৮-২০০৯ সেশন থেকে শুরু করে অদ্যাবধি প্রায় ২০ হাজার নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর দেওয়া ছাত্র সংসদ ফান্ডে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা জমা পড়েছে। কিন্তু ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে মাথা ব্যথা নেই প্রশাসনের। গণঅভ্যুত্থান চলাকালীন শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ৯ দফার মধ্যে অন্যতম দাবী ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের। গণঅভ্যুত্থানের পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন সিন্ডিকেট সভা করে ক্যাম্পাসে লেজুরবৃত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধের ঘোষণা দেন। এরপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনে ছাত্র সংসদ যুক্ত করে নির্বাচনের দাবীতে সংবাদ সম্মেলন, মানববন্ধন, উপাচার্য বরাবর স্মারকলিপি প্রদান, লিফলেট বিতরণসহ নানা আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে আসছিল শিক্ষার্থীরা। এরপরও দাবি আদায় না হওয়ায় আমরণ অনশনে বসেছে তারা। 

ইত্তেফাক/এমএএস