দাম কম থাকায় হিমাগারের আলু নিতে আগ্রহ নেই, বাড়ছে লোকসানের বোঝা

আপডেট : ২২ আগস্ট ২০২৫, ১৬:০৮

দিনাজপুরের ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে এজেন্টের মাধ্যমে ৪৫ বস্তা আলু রেখেছেন হাকিমপুর হিলি ডাঙাপাড়া এলাকার কৃষক আব্দুর রহমান। দাম কম থাকায় এখনও বিক্রি করেননি তিনি। এ আলু মৌসুমে বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। চার মাস পরও ৬৫ কেজির এক বস্তা বিক্রি হচ্ছে ৬২০ থেকে ৬৩০ টাকায়। 

এ দামে আলু বিক্রি করলে ৪৫ বস্তায় ৪৫ হাজার টাকার বেশি লোকসান হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমন ধান রোপণের খরচ জোগাতেই এজেন্টের মাধ্যমে তিনি ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে আলু রেখেছিলেন। শুধু তিনিই না, বিপদে আছেন তার মতো অনেক কৃষক।

কৃষকের মতো ব্যবসায়ী এবং হিমাগার মালিকও উদ্বেগে দিন পার করছেন। তারা বলছেন, প্রতিদিন আলুর দাম কমছে। ফলে মূলধন হারাচ্ছেন। এখন এক বস্তা (৬৫ কেজি) বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ৬৫০ টাকায়। হিমাগার ভাড়া বাদে কৃষক পাচ্ছেন মাত্র ২২০ থেকে ২৩০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগে ছিল ৭২০ টাকা বস্তা। চলতি সপ্তাহে গড়ে ৬২০ টাকায় বিক্রি হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, আলু কিনে তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে। বেচাকেনাও ধীরগতিতে চলছে। ফলে হিমাগারে মজুত কমছে না। গত বছর এমন সময়ে মজুতের ৬০ভাগ আলু বিক্রি হলেও এবার ৯০ ভাগ আলু পড়ে রয়েছে হিমাগারে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। ফলে হিমাগারে মজুদআলু নিয়ে বিপদে আছেন হিমাগার মালিকও।

হিমাগারে সংরক্ষণ পর্যন্ত সব মিলিয়ে ৬৫কেজির পরিবহন-শ্রমিকসহ এক বস্তায় খরচ হয়েছে এক হাজার থেকে এক হাজার ১০০ টাকা পর্যন্ত। সংরক্ষণের চার মাস পর ৬২০ থেকে ৬৩০ টাকায় বিক্রি করে ব্যবসায়ীদের ব্যাংক সুদসহ লোকসান ৮৮০ থেকে ৯০০ টাকা। আর কৃষক সব খরচ বাদে বস্তায় ২২০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত পাচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, চাহিদা কম থাকায় পাইকারি বাজারে দাম কমছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে কৃষক ভাড়াও দিতে পারবেন না। দাম কম জেনে তারা বিক্রি করতেও আসছেন না। মজুত বেশি থাকায় দুশ্চিন্তায় রয়েছেন হিমাগার মালিক।

নবাবগঞ্জের আফতাবগঞ্জ এলাকার নারী কৃষক বিজলী লাভের আশায় ৬৫ কেজি ওজনের দুই বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছেন হিমাগারে। কিন্তু দাম কমে যাওয়ায় এখন লাভ তো  দূরের কথা সংরক্ষণ খরচই তুলতে পারছেন না।

ফুলবাড়ী উপজেলার পাকাপান গ্রামের কৃষক শাহজাহান আলী বলেন, চার বিঘা ৬৫ কেজি ওজনের ২০ বস্তা আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। যাতে আমন আবাদের সময় বাড়তি কিছু লাভ হলে সেই লাভ দিয়ে আমন খরচ মেটাবেন। কিন্তু এখন লোকসানের ভয়ে আলু বের করছেন না হিমাগার থেকে।

কৃষকদের আলু সংরক্ষণকারি এজেন্ট হিলি ডাঙ্গাপাড়া এলাকার আজমল হোসেন বলেন, এলাকার কৃষকদের একত্রে করে ২ হাজার ৮০০ বস্তা আলু ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা হয়েছে। আলুর দাম কম হওয়ায় কৃষকরা আলু বের করতে চাচ্ছেন না, তবে এখন পর্যন্ত ৩৫০ বস্তা আলু বের করা হয়েছে। অবশিষ্ট পড়ে রয়েছে হিমাগারে। কবে আলুর বস্তা বের করা যাবে তারও নিশ্চয়তা নেই।

বড়পুকুরিয়া এলাকার কৃষক মোবারক হোসেন লাভের আশায় ১০০ বস্তা আলু রেখেছিলেন। চার মাস পর বিক্রি করে পেয়েছেন ২২ হাজার টাকা। হিমাগারে রাখার সময় খালি বস্তা ৮০ টাকা, প্যাকেট করে ওজন ও সুতলি বাবদ ৩৫ টাকা ও পৌঁছানোর খরচ হয়েছে ৫০ টাকা। সব মিলিয়ে বস্তায় ১৬৫ টাকা করে আগেই খরচ হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগের খরচ বাদে ১০০ বস্তা আলু বিক্রি করে মাত্র সাড়ে ৫ হাজার টাকা পেয়েছি। অথচ মৌসুমে বিক্রি করলে পাওয়া যেত ৬০ হাজার টাকা। আলু আবাদ করে কৃষকের মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেছে।’

ফুলবাড়ী বাজারের ব্যবসায়ী অজয় দত্ত ও জয়ন্ত সাহা বলেন, ‘আলুর দাম বেশি হলে প্রশাসনের লোক দাম কমানোর জন্য ব্যবসায়ী ও কৃষকদের চাপ দেয়। এবার দাম বাড়ানো নিয়ে কারও মাথা ব্যথা নেই।’ বেশি দামে আলু কিনে কম দামে বিক্রি করতে গিয়ে অনেক ব্যবসায়ীর পূঁজি হারিয়ে গেছে।

দাম না থাকায় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা হিমাগারের আলু নিতে আসছেন না জানিয়ে ফুলবাড়ী কোল্ড স্টোরেজের প্রধান হিসাব ব্যবস্থাপক আবুল হাসনাত বলেন, এবার ক্রয়-বিক্রয়ের চিত্র উল্টো। ব্যবসায়ীরা বেকার সময় কাটাচ্ছেন। গত বছর এ সময়ে অর্ধেকেরও বেশি আলু হিমাগার থেকে বের হয়েছে। অথচ এবার বের হয়েছে ৭ থেকে ৮ শতাংশ। এ বছর কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে এক লাখ ৮০ হাজার বস্তা। এরমধ্যে এখন পর্যন্ত বের হয়েছে মাত্র ৯ হাজার বস্তা। নির্ধারিত সময়মীমা আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে সব আলু বের হবে কিনা, তা নিয়ে মালিকপক্ষ দুশ্চিন্তায় আছেন।

ইত্তেফাক/এএইচপি