চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলায় সম্প্রতি বেড়ে গেছে চুরির ঘটনা। প্রতিদিনই কোনো না কোনো ইউনিয়নে গরু-মহিষের খামার, ঘর-বাড়ি কিংবা অটোরিকশা চুরির খবর মিলছে। চোরের হানা থেকে বাদ যাচ্ছে না মসজিদ-মন্দিরও। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সাধারণ গ্রামবাসী। চোরদের এমন দৌরাত্ম্যে এলাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। চুরিসহ নানান অপরাধ ঠেকাতে রাউজান থানা পুলিশ নিয়মিত টহল দিলেও, তাদের কার্যকর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আওয়ামী লীগ শাসনামলে রাউজানে একাধিক গরু, মোটরসাইকেল ও সিএনজি চালিত অটোরিকশা চুরির, চট্টগ্রাম বিদ্যুৎ কেন্দ্রের তার চুরির মত বড় ঘটনা ঘটনা ঘটলেও বসতঘর চুরি-ডাকাতি ঘটনা তেমন ঘটেনি। গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে বসতঘর ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে চুরির ঘটনা বেড়েছে। চোররা নিত্যদিন কোথাও না কোথাও হানা দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া কয়েকটি চুরির ঘটনার মধ্য উল্লেখযোগ্য- গত ১৭ আগস্ট ভোরে ৩টার দিকে রাউজান উপজেলার কদলপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের ফকিরছড়ি হাট সংলগ্ন বৃদ্ধ কৃষক নুরুল আলমের প্রায় ৪ লাখ টাকা দামে ২ দুটি মহিষ চুরি করে পিক-আপে তুলে নিয়ে যায়। যা একটি মন্দিরের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়। এর এক সপ্তাহ পূর্বে ৯ আগস্ট ভোর ৪টার দিকে একই কায়দায় তার ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ষাড় গোয়াল ঘর থেকে নিয়ে যায়।
গত ৬ আগস্ট ভোর সাড়ে ৩ টার দিকে পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম গহিরার সিকদার বাড়ি থেকে মো. পারভেজের ১টা গাভী গরু ও কাজী বাড়ির প্রবাসী নুরুল ইসলামের ৩টা গরু চুরি হয়ে যায়।
গত ১৯ আগস্ট মঙ্গলবার রাতে পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডের আবদুল গফুর চৌধুরী বাড়ির প্রবাসী আশরাফ আলী আদনান ও প্রবাসী মো. আরজুর বসত ঘরের জানালার গ্রিল কেটে প্রবেশ করে আলমিরা ভেঙে নগদ ১০ হাজার টাকা ও দেড় ভরি স্বর্ণালংকার চুরি করে নিয়ে যায়।
একইভাবে গত ১৭ জুলাই দিবাগত রাতের যেকোনো সময়ে বাগোয়ান ইউনিয়নের গরীবুল্লাহ পাড়া এলাকার দোস্ত মোহাম্মদের নতুন বাড়ির ব্যবসায়ী মো. তসলিম উদ্দিন খান ও প্রবাসী মুসলিম উদ্দিন খানের পাকা বসত ঘরের সদর দরজার থালা লাগানোর হুক কেটে প্রবেশ করে সাড়ে ৮ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, ফার্নিচার বিক্রির নগদ ৮৫ হাজার টাকা ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চুরি করে নিয়ে যায়। পরের দিন ১৮ জুলাই জুমার নামাজের সময় একই কায়দায় চুরির ঘটনা ঘটে উপজেলার কদলপুর ইউনিয়ন পরিষদের সম্মুখে জুয়েল উদ্দিন চৌধুরীর বাড়িতে।
তার ভাই রিফাত উদ্দিন চৌধুরী জানান, তার ভাইয়ের পরিবার একটি দাওয়াতে গিয়েছিলেন। যেখানে চোররা ২ ভরি গয়না ও নগদ ৩ লাখ টাকা নিয়ে যায়। এরচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে গত ২২ জুলাই রাউজান উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মহামুনি গ্রামের যোগেন্দ্র আরাম বিহার সংলগ্ন মৃত সুদর্শন বড়ুয়ার বাড়িতে। সেখানে চুরি করতে এসে ১৫-২০ জনের একটি দল বৌ-শাশুড়িকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ডাকাতি করে চলে যায়।
এছাড়া গত ১৭ আগস্ট (রোববার) রাতে রাউজান পৌরসভার ৮ নম্বর ডাক্তার মার্কেটের রাইসমিল ও আসবাবপত্র তৈরি কারখানায় চুরি করার পর অগ্নিসংযোগ করে পালিয়ে যায় চোরের দল।
চোরের হানা থেকে বাদ পড়েনি মসজিদ-মন্দিরও। ‘চোরে শুনে না ধর্মের কাহিনী’ প্রবাদটি প্রমাণ করতে মরিয়া চোর চক্র গত ১৮ আগস্ট উত্তর গশ্চি গ্রামের আমিনুর রহমান জামে মসজিদে মুসল্লি সেজে প্রবেশ দান বক্স এবং ৭ আগস্ট বিকালে পূর্বগুজরা ইউনিয়নের ছৈয়দ আউলিয়া বাড়ি জামে মসজিদে প্রবেশ করে মাইক চালানোর উন্নত প্রযুক্তির মেশিন চুরি করে নিয়ে যায়। উক্ত ঘটনা দুটি সিসিটিভি ফুটেজে ধরা পড়ে।
১৩ জুলাই রাতে উপজেলার পাহাড়তলী ইউনিয়নের উত্তর দেওয়ানপুর ব্রাহ্মণপাড়ার রাখাল ঠাকুর বাড়ির শতবর্ষ পুরনো মন্দিরে ঘটে চুরির ঘটনা। যেখানে বেশ কিছু মূর্তি ও পূজার উপকরণ চুরি হয়। স্থানীয়রা মতে, এমন ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কদলপুরে ভুক্তভোগী বৃদ্ধ কৃষক নুরুল আলম বলেন, আমি বিগত ৩ বছর ধরে কৃষিকাজের পাশাপাশি ধার-কর্জ করে কোরবানির ঈদ ও ওরশে বিক্রির জন্য গরু-মহিষ পালন করছি। চোরের উৎপাতের কারণে রাত নির্ঘুম পাহারা দিয়ে ফজরের নামাজের সময় বাড়ি ফিরে নামাজ পড়ে বিশ্রাম নেই। চোররা আমাকে পাহারা দিয়ে এই সময়ে এক সপ্তাহের মধ্যে একটি ষাড় ও দুটি মহিষ নিয়ে যায়। যার আনুমানিক মূল্য ৫লাখ টাকা। সারা বছরের লাভ এক সপ্তাহে শেষ করে দিল চোরের দল।
একই ইউনিয়নের রিফাত উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আমার ভাই জুয়েল উদ্দিন চৌধুরীর পরিবার জুমার দিন দাওয়াতে গিয়েছিল। দিনেদুপুরে ঘরের সদর দরজার হুক কেটে প্রবেশ ২ ভরি স্বর্ণালঙ্কার ও ঘরের কাজের নগদ ৩ লাখ টাকা নিয়ে যায়।
পাহাড়তলী ইউনিয়ন মো. ইমরুল বলেন, দেড় যুগেরও বেশি সময় আমাদের এলাকায় চুরি ঘটনা ঘটে নি। এবার সিঁড়ি ঘরের টিনের চাল কেটে আমার বাবা, স্ত্রীকে জিম্মি করে ডাকাতি করে সব নিয়ে গেল।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পুলিশের টহল সত্ত্বেও চুরির ঘটনা কমছে না। এতে তারা বেশ উদ্বিগ্ন।
নোয়াপাড়া ইউনিয়নের মীর হোসেন সওদাগরের বাড়ির সমাজকর্মী ও ছড়াকার সরোয়ার রানা মনে করেন, চুরি বন্ধে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করলে হবে না। প্রতিটি গ্রামে গ্রাম পাহারা ও সচেতনতা কার্যক্রম বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মাদক ও বেকারত্ব সমস্যার দিকেও নজর দেওয়া জরুরি।
স্থানীয়রা সচেতন নাগরিক সমাজ মনে করেন, একদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি আরও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণ ও সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করলে চুরি ও অপরাধ দমন সম্ভব হতে পারে।
এ বিষয়ে রাউজান থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মনিরুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, আমরা নিয়মিত টহল পরিচালনা করছি, রাতে বিভিন্ন স্পটে চেকপোস্ট বসিয়েছি। ঘটনায় জড়িতদের সনাক্ত করে আটকের জন্য অভিযান পরিচালনা করেছে এবং কয়েকটি ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে আটকও করেছি। তবে দুঃখের বিষয় চুরির ঘটনায় কাউকে আটক করলে ভুক্তভোগীদের অধিকাংশ মামলার বাদী হতে চায় না।
তিনি আরও জানান, চোরচক্রকে চিহ্নিত করতে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই চুরি কমে আসবে।
