গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি ব্যাপক চুক্তি সম্ভব, কিন্তু ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে আলোচনাকে ভণ্ডুল করে দিচ্ছেন এবং আক্রমণ অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিচ্ছেন। হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাহমুদ মারদাউই এ কথা বলেছেন।
শনিবার (২৩ আগস্ট) এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, 'একটি বিস্তৃত চুক্তি সম্পূর্ণরূপে সম্ভব, কিন্তু নেতানিয়াহুই এটি ঘটতে বাধা দিচ্ছেন। তিনি অধিকৃত অঞ্চলের অভ্যন্তরে তার রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান।'
মারদাউই বলেন, ইসরায়েলি নেতা গাজা যুদ্ধবিরতির জন্য আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীদের (মিসর, কাতার) সর্বশেষ প্রস্তাবের সরাসরি সাড়া দেননি, বরং সময় নষ্ট করার লক্ষ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন।
তিনি উল্লেখ করেন, 'হামাস কোনো আপত্তি ছাড়াই মিশরীয় ও কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের উপস্থাপিত প্রস্তাবগুলোতে সম্মত হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত ছিল। তবে নেতানিয়াহু আলোচনাকারী দল পাঠাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং আলোচনা বন্ধ করে দেওয়ার ও এড়িয়ে যাওয়ার নীতি অনুসরণ করে চলেছেন।'
হামাসের এই উচ্চপদস্থ সদস্য জোর দিয়ে বলেন, তার দল এমন কোনো পরিকল্পনার বিরোধিতা করে না, যার ফলে ইসরায়েলি নৃশংসতা বন্ধ হবে, ফিলিস্তিনি বন্দীদের বিনিময়ে ইসরায়েলি বন্দীদের মুক্তি দেওয়া হবে, মানবিক সাহায্যের অবাধ প্রবেশাধিকার থাকবে এবং সম্পূর্ণ ফিলিস্তিনি দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে গাজা পুনর্গঠন করা হবে।
এদিকে, ইসরায়েলি 'চ্যানেল ১০' টেলিভিশন চ্যানেল এক প্রতিবেদনে সামরিক সূত্রের বরাতে জানিয়েছে, নেতানিয়াহু এখন পর্যন্ত পাঁচ বার চুক্তিতে পৌঁছানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছেন।
মারদাউইদ ইসরায়েলি মিডিয়ার প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বলেন, মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরও স্বীকার করেছে, ডানপন্থী লিকুদ রাজনৈতিক দলের ৭৫ বছর বয়সী নেতা নেতানিয়াহু চুক্তিতে বাধা দিচ্ছেন এবং গাজা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করার ওপর জোর দিচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, দখলদার সরকার খাদ্য গুদাম, জলের কূপ এবং স্টোরেজ ট্যাঙ্কে বোমা হামলা চালাচ্ছে। মানবিক সাহায্য নিতে জড়ো হওয়া বেসামরিক নাগরিকদেরও লক্ষ্যবস্তু করে চলছে। এগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানবিক বিপর্যয় আরও বাড়িয়ে তুলেছে।
মারদাউই আরও বলেন, জাতিসংঘ আনুষ্ঠানিকভাবে গাজায় দুর্ভিক্ষের বিস্তার নিশ্চিত করেছে। হামাসের এই জ্যেষ্ঠ সদস্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি 'কেবল প্রতিবেদনেই সন্তুষ্ট না থেকে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে দুর্ভিক্ষ ও গণহত্যা বন্ধে বাস্তবসম্মত এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তাদের আইনি ও মানবিক দায়িত্ব পালন করার' আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, 'বিশ্ব মানবতা ও সভ্যতা এক বাস্তব পরীক্ষার মুখোমুখি। গাজায় অপরাধের জন্য দখলদার শাসকগোষ্ঠীকে শাস্তি পেতে হবে। নেতানিয়াহুর নীতিকে সমর্থন করা বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ প্রয়োগ করাও জরুরি।'
এদিকে, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুসারে, অঞ্চলজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৬২ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। একই সময়ে দেড় লাখের বেশি বেশি মানুষ আহত হয়েছে। অনেকেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন।
চলতি বছরের শুরুতে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গের পর ২৭ মে থেকে ইসরায়েল জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোকে এড়িয়ে গাজা হিউম্যানিটেরিয়ান ফাউন্ডেশন-এর মাধ্যমে একটি পৃথক সাহায্য বিতরণ উদ্যোগ শুরু করেছে। এতে সমর্থন দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এই পদক্ষেপ বিশ্বব্যাপী ত্রাণ সম্প্রদায় ব্যাপকভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইসরায়েলি বাহিনী খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রের কাছে জড়ো হওয়া ফিলিস্তিনিদের ওপর গুলি চালিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে শত শত মানুষ নিহত হচ্ছে।
গত বছরের নভেম্বরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত গাজায় যুদ্ধাপরাধ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য নেতানিয়াহু ও তার প্রাক্তন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। উপত্যকাজুড়ে যুদ্ধের জন্য ইসরায়েল আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে গণহত্যার মামলার মুখোমুখি।
