গোটা সামার অ্যাথলেটিকসে সবার নজর ছিল ১০০ ও ২০০ মিটার স্প্রিন্টে। কারণ সেখানে দেশের তারকা অ্যাথলেটরা অংশ নিয়েছেন-ইমরানুর রহমান, শিরিন আক্তার, সুমাইয়া দেওয়ানদের মতো স্প্রিন্টাররা ছিলেন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে তাদের মাঝ থেকে আলো কেড়ে নিলেন নৌবাহিনীর এক অ্যাথলেট, নড়াইলের মেয়ে রিনকী বিশ্বাস। তিন দিনে চার ইভেন্টে জাতীয় রেকর্ড গড়ে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সবাইকে।
১৭তম জাতীয় সামার অ্যাথলেটিকসের প্রথম দুদিনেই তিনটি ইভেন্টে রেকর্ড ভেঙে নজর কাড়েন রিনকী। শেষ দিনেও সবার চোখ ছিল তার দিকে। কারণ একটি ইভেন্ট তখনো বাকি। ১০ হাজার মিটার দৌড়। সেখানেও বাজিমাত করলেন নৌবাহিনীর এই স্প্রিন্টার। ভেঙে দিলেন তিন বছর আগে ঢাকায় গড়া পাপিয়া খাতুনের রেকর্ড। ৪০০ মিটারের ট্র্যাক ঘুরলেন ২৫ বার, সময় নিলেন ৩৯ মিনিট ১৪.৭৩ সেকেন্ড। ইভেন্ট শেষে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। ক্লান্ত শরীর, ভেজা জার্সি, কিন্তু অদেখা এক হাসি তখনো লুকিয়েছিল তার চোখে। জানতেন না, এই ইভেন্টেও ইতিহাস গড়েছেন তিনি। সঙ্গীরা তাকে ধরাধরি করে ঘাসে বসাল, পানি ছিটাল ও পরিচর্যা করল। কিছুক্ষণ পর খবর এলো ১০ হাজার মিটারেও জাতীয় রেকর্ড! আনন্দে চোখ ভিজে উঠল সবার।
তবে ক্লান্তির ভারে তখন আর উল্লাস করার শক্তি নেই রিনকীর। বাহিনীর পক্ষ থেকে দেওয়া হলো নগদ অর্থ পুরস্কার। তার পরিশ্রমের এক ক্ষুদ্র স্বীকৃতি। শুধু দৌড় নয়। এক সময় কাবাডি-ফুটবল-হকি সব খেলেছেন রিনকী। তবে এখন সেই সবে নেই। এখন তিনি দৌড়বিদ। কীভাবে এসেছেন এই পথে, ইভেন্ট শেষে দৈনিক ইত্তেফাককে তিনি শুনিয়েছেন সেই গল্প। ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের গল্প শুনিয়ে তিনি বলেন, 'স্কুল থেকেই খেলি। সিলেট ডিভিশনের হয়ে বয়সভিত্তিক ফুটবলও খেলেছি।'
ফুটবল ছেড়েছেন নৌবাহিনীতে চুক্তিভিত্তিক খেলোয়াড় হিসেবে সুযোগ পাওয়ার পরই। দৌড়বিদ হওয়ার গল্প শুনিয়ে এ সময় বলেন, 'জাতীয় জুনিয়র মিটে অংশ নেওয়ার পর ২০১৮ সালে নৌবাহিনী আমাকে দলে নেয়। তখন থেকেই এই বাহিনীর হয়ে খেলছি।'
এখন রিনকী লম্বা রেসের রাজকন্যা। ছোট খাটো দূরত্বে দৌড়ান না তিনি। বলা যায় ছোট দূরত্বের দৌড় তার জন্য নয়। ২০১৮ সালে ট্র্যাকে তার দৌড় শুরু ১৫০০-৩০০০ মিটার হলেও এখন এর বাইরেও রিনকী ৫ হাজার এবং ১০ হাজার মিটারে দৌড়ান। ১৫০০ মিটারে তার স্বর্ণ পদক রয়েছে ছয়টি এবং ৩০০০ হাজার মিটারে স্বর্ণ পদক রয়েছে পাঁচটি। আর ৫ হাজারে রয়েছে তিনটি স্বর্ণ পদক। আর ১০ হাজারে এবারসহ দুটি স্বর্ণ পদক। এর কমে তিনি অংশই নেন না স্প্রিন্টে। এ নিয়ে বলেন, 'আমি শুরু থেকেই বড় দূরত্বের স্প্রিন্টে অংশ নেই। আমার বিশ্বাস ছিল, আমি পারবো। সেটাই করে দেখাচ্ছি। আজকে (গতকাল) একটু গরম ছিল কিন্তু আমি পেরেছি।'
এবারের সামার অ্যাথলেটিকসের জন্য ছয় মাস আগে থেকে নৌবাহিনীর কোচ নুরজামানের দিকনির্দেশনায় অনুশীলন শুরু করেন রিনকী। প্রতিদিন তিন ঘণ্টা করে কঠোর পরিশ্রম করেছেন তিনি। যার ফল পেয়েছেন গেল তিন দিনে। চার ইভেন্টে জাতীয় রেকর্ড গড়ে ৬০ হাজার টাকা পুরস্কার পাবেন রিনকী। এই টাকা দিয়ে কী করবেন তা জানতে চাইলে বলেন, 'আমি এই টাকা থেকে কিছু অর্থ পরিবারকে দেবো। আর আমার জন্য দরকারি কিছু ক্রীড়াসামগ্রী কিনবো।'
রিনকী এবারের প্রতিযোগিতায় রেকর্ড গড়েছেন ট্র্যাকে খালি পায়ে দৌড়ে। অর্থাভাবে স্পাইক ছাড়া দৌড়েছেন কি না তা জানতে চাইলে বলেন, 'না, জুতো পড়ে দৌড়ালে আমার পা গরম হয়ে যায়, মনে হয় আমার গতি কমে যায়। তাই আমি জুতো ছাড়াই ট্র্যাকে দৌড়েছি।' এ সময় ভবিষ্যতে নিজেকে কোথায় দেখতে চান জানতে চাওয়া হলে বলেন, 'আমি আরও ভালো অ্যাথলেট হতে চাই। দেশকে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট থেকে পদক এনে দিতে চাই।'
