সালমান-আনিসুল-আরাফাত সিন্ডিকেট ডিপ স্টেটের এজেন্ট, নাকি হাসিনার পতনের রাসপুতিন?

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:০০ এএম

অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের এক বছর পর, তার সরকারের শেষ দিনগুলোর ভেতরের রহস্য নিয়ে নতুন দৃশ্যকল্প হাজির করেছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ ইনডিয়া। দাবি করা হচ্ছে—সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক ও মোহাম্মদ এ আরাফাতকে মার্কিন ‘ডিপ স্টেট’ নিয়ন্ত্রণ করেছিল। কিন্তু তারা কি সত্যিই এজেন্ট, নাকি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পতন ঘটানো কালা জাদু করা রাসপুতিন? তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে সাংবাদিক চন্দন নন্দী তার প্রতিবেদনে লিখেছেন—২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর কয়েক মাস আগে থেকেই তার সরকারের তিনজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে মার্কিন ‘ডিপ স্টেট’ এমনভাবে প্রভাবিত করেছিল, যাতে তাদের কর্মকাণ্ড শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের স্বার্থের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়।

নর্থইস্ট নিউজে বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ঠেকাতে ব্যর্থতার পেছনে সরকারের তিন প্রভাবশালী ব্যক্তির রহস্যজনক ভূমিকা ছিল। আর সেই ভূমিকা শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেয় মার্কিন ‘ডিপ স্টেট’-এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

৫ অগাস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালান। ১৩ অগাস্ট ঢাকার সদরঘাট থেকে গ্রেপ্তার হন সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হক। আরাফাত পশ্চিমা যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে বিদেশে পালিয়েছেন, বর্তমানে তিনি ভুটানে অবস্থান করছেন। ভুটানিজ পাসপোর্ট ব্যবহার করে তিনি ভারত, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুরে যাওয়া্ আসা করেন

হাসিনার মন্ত্রিসভার একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী পত্রিকাটিকে বলেছেন, ‘দরবেশ’ নামে পরিচিত সালমান নিয়মিত মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতেন এবং হাসিনাকে অনেকটা দূরে রাখতেন। ২০২৩ সাল থেকেই তারা বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে যোগাযোগে ছিলেন। শেখ হাসিনা কখনোই তাদের বিশ্বাসঘাতকতা সন্দেহ করেননি।

তবে ডিপ স্টেটের সরাসরি এজেন্ট না হলেও, সালমান-আনিসুল-আরাফাতের এই সিন্ডিকেট যেন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধেই নিজস্ব এক ‘ডিপ স্টেট’ গড়ে তোলে—এমনটাই জানিয়েছে নির্ভরযোগ্য সূত্র। আরও জানা যায়, ২০১৮ সাল থেকেই তারা হাসিনাকে দলীয় নেতাকর্মীদের কাছ থেকে কালা জাদুর মতো বিচ্ছিন্ন করে দেন, যা করোনা সময়ে আরও গভীর হয়। তাদের প্রভাববলয়ে হাসিনা হয়ে ওঠেন নিছক পুতুল। আর বাকিরা আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সেই সময় সালমান এফ রহমানকে প্রধানমন্ত্রী-ডিফেক্টো বলা হতো। কিন্তু কি তিনি সত্যিই এত ক্ষমতাশালী ছিলেন, নাকি শুধুই ইমপ্রেশন দেখাতেন?  সূত্র জানায়, সালমান এফ রহমান সবসময় হাসিনার আশেপাশে থাকতেন। কোথাওই কাউকে হাসিনার কাছে ঘেঁষতে দিতেন না। সংসদ অধিবেশনের পর, শেখ হাসিনার সঙ্গে নেতাকর্মীদের অবাধ যোগাযোগ ঠেকাতে, তিনি রুমের পাশে চেয়ার পেতে বসতেন। হাসিনার সঙ্গে ফ্লাইট না হলে পরদিনও বিদেশ যেতেন, এমনকি জোর করে ডেলিগেশনে ঢুকতেন।

সূত্র জানায়, সালমান এফ রহমান শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়েরও কড়া নজর রাখতেন। জয়ের ফ্লাইটে ফার্স্ট ক্লাসের সব টিকিট তিনি নিজেই বুক করতেন, যাতে হাসিনার পরিবারের সঙ্গে কেউ যোগাযোগ করতে না পারে।

আমেরিকান অ্যাম্বাসিতে শেখ হাসিনার রাসপুতিন হিসেবে পরিচিত ছিলেন সালমান এফ রহমান ও আরাফাত। ডিপ্লোম্যাট কমিউনিটিতে এই নামেই ডাকা হতো তাদের। রাশিয়ার রাজনীতিতে গ্রিগরি রাসপুতিন ছিলেন জার পরিবারের কাছে প্রভাবশালী আত্মীয় ও আধ্যাত্মিক উপদেষ্টা, যিনি জারিনের ওপর বিশাল রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাব ফেলেছিলেন।

নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, সাবেক তথ্য প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাতের বেশিরভাগ বক্তব্য মিথ্যাচারে পরিপূর্ণ ছিল। সূত্র তাকে ‘সাইকোপ্যাথ লায়ার’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। আরাফাত মিথ্যা অনলাইন সার্ভে দেখিয়ে শেখ হাসিনাকে বোঝাতেন যে, আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জয় নিশ্চিত। তরুণ প্রজন্মের সঙ্গে শক্তিশালী যোগাযোগ থাকায় আরাফাতকে পছন্দও করতেন হাসিনা।

সূত্র জানায়, রাতের কাজ শেষে বৈঠকে বসতেন আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমান। তারা ঠিক করতেন কে আওয়ামী লীগের সদস্য বা মন্ত্রী হবে। মার্কিন কর্মকর্তা ডোনাল্ড লুর সফরে সালমান তার বাসভবনে ব্রেকফাস্ট মিটিং আয়োজন করেন—বাংলাদেশে এমন ঘটনা প্রথম ।

অনেকে মনে করেন, সালমান এফ রহমান, আনিসুল হক ও আরাফাতের রাজনীতি আওয়ামী লীগের প্রবীন নেতাদের মতো ছিল না। তাদের শক্তি ছিল টাকা, আর উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও লোভ। অভিযোগ, এই তিনজনের সিন্ডিকেট সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ওপর কালো জাদুর মতো প্রভাব ফেলেছিল, এমনকি তার ছেলে জয়ও তাদের নিয়ন্ত্রণে ছিলেন।

নর্থইস্ট নিউজের খবরে সালমান, আনিসুল, আরাফাত মার্কিন ডিপ স্টেটের নিয়ন্ত্রণে ছিল বলা হলেও আসলেই তা সত্য কিনা, সেটা প্রমাণসাপেক্ষ। কিন্তু তারা যে আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা ডিপ স্টেট বানিয়েছেন তা বলাই বাহুল্য। আওয়ামী লীগের পতনের জন্য এই তিন নেতাকে অনেকাংশেই দায়ী বলে ভাবছেন দলের নেতাকর্মীরা। কারণ তিনজন নন-পলিটিক্যাল ব্যক্তি আওয়ামী লীগের সবচেয়ে শক্তিশালী নেতায় পরিণত হন।

ইত্তেফাক/আরআর