কেন ধীরগতির ট্রেনে ভ্রমণ করেন কিম, কী আছে এর ভেতরে

আপডেট : ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:১৮

উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন সোমবার (১ সেপ্টেম্বর) পিয়ংইয়ং থেকে সবুজ রঙের বিশেষ ট্রেনে করে বেইজিংয়ের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন। বহু দশক ধরে দেশটির শীর্ষ নেতাদের জন্য এ ধরনের বিশেষায়িত ধীরগতির বুলেটপ্রুফ ট্রেনই প্রধান ভ্রমণ মাধ্যম।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিমানের তুলনায় এসব ট্রেন কেবল বেশি নিরাপদই নয়, বরং আরামদায়কও। বিশাল সফরসঙ্গী দল, নিরাপত্তারক্ষী, খাবার-দাবার এবং বৈঠকের পূর্বপ্রস্তুতির জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ এই ট্রেনেই সহজলভ্য।

দক্ষিণ কোরিয়ার পরিবহন বিশেষজ্ঞ আহন বিয়ং-মিন জানিয়েছেন, নিরাপত্তার কারণে উত্তর কোরিয়া একাধিক ট্রেন ব্যবহার করে। প্রতিটি ট্রেনে থাকে ১০ থেকে ১৫টি বগি। এর কিছু বগি কেবল কিমের জন্য সংরক্ষিত, যেখানে শয়নকক্ষ, ব্যক্তিগত অফিস ও যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে। অন্য বগিগুলোতে অবস্থান করেন নিরাপত্তারক্ষী ও চিকিৎসক দল। এমনকি ট্রেনে রয়েছে রেস্টুরেন্ট এবং দুটি সাঁজোয়া মার্সিডিজ গাড়ি বহনের সুবিধাও। ছব: রয়টার্স

রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, সবুজ বগির বাইরে কর্মকর্তাদের সঙ্গে ধূমপান বিরতি নিচ্ছেন কিম। ট্রেনের ভেতরে সোনালি প্রতীক খোদাই করা কাঠের দেয়ালঘেরা অফিসকক্ষে তাকে পতাকার সামনে বসা অবস্থায়ও দেখা যায়। তার টেবিলে থাকে সোনালি প্রতীকযুক্ত ল্যাপটপ, একাধিক টেলিফোন, সিগারেটের বক্স এবং পানীয় ভর্তি বোতল। জানালাগুলো সজ্জিত নীল-সোনালি পর্দায়।

২০১৮ সালে প্রচারিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, কিম একটি প্রশস্ত বগিতে গোলাপি সোফায় বসে চীনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। ২০২০ সালে ঘূর্ণিঝড়ে বিধ্বস্ত এলাকা পরিদর্শনেও তাঁকে এই ট্রেনে যেতে দেখা গেছে। তখন ট্রেনের ভেতরে ফুলের আকারের আলোকসজ্জা এবং জেব্রা নকশার কাপড়ের আসবাব ক্যামেরায় ধরা পড়ে।

রাশিয়ার সাবেক কর্মকর্তা কনস্তান্তিন পুলিকভস্কি তার বই অরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে কিম জং ইল-এর (কিম জং উনের বাবা) মস্কো সফরের বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন, সেই ট্রেনে ফ্রান্স থেকে আনা বোর্দো ও বোঝোলাই ওয়াইন পরিবেশন হতো, এমনকি জীবন্ত লবস্টারও সরবরাহ করা হয়েছিল।

২০২৩ সালে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিতে গেলে সীমান্তে কিমের ট্রেনের চাকাগুলো পুনঃসংযোজন করতে হয়েছিল, কারণ উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার রেলপথের গেজ আলাদা। তবে চীনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে এমন জটিলতা নেই। সীমান্ত পার হওয়ার পর স্থানীয় চালকরা ট্রেন চালান, কারণ তারা রেলসিগন্যাল ও নেটওয়ার্ক সম্পর্কে ভালো জানেন।

চীনে পূর্ববর্তী সফরগুলোতে কিমের ট্রেন সাধারণত চীনা তৈরির সবুজ রঙের ডিএফ১১জেড লোকোমোটিভ দিয়ে টানা হতো। ২০১৯ সালে ভিয়েতনামে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে যোগ দিতে গেলে ট্রেনটি চীন অতিক্রম করেছিল লাল-হলুদ রঙের লোকোমোটিভে, যাতে ছিল চীনের জাতীয় রেলওয়ের প্রতীক।

গতি সম্পর্কে আহনের তথ্য অনুযায়ী, চীনের রেলপথে কিমের ট্রেন সর্বোচ্চ ঘণ্টায় প্রায় ৮০ কিলোমিটার বেগে চলে, তবে উত্তর কোরিয়ার রেলপথে এ গতি সর্বাধিক ৪৫ কিলোমিটার।

উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠাতা নেতা এবং কিম জং উনের দাদা কিম ইল সুং ১৯৯৪ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিয়মিত ট্রেনে বিদেশ সফর করেছেন। তার ছেলে কিম জং ইলও কেবল ট্রেনেই রাশিয়া সফর করেছিলেন তিনবার। ২০০১ সালে তিনি প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করে মস্কো পৌঁছান।

২০১১ সালের শেষ দিকে এক ট্রেন সফরকালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন কিম জং ইল। বর্তমানে তার ব্যবহৃত বগিটি সমাধিসৌধে প্রদর্শিত হচ্ছে।

এই ট্রেন উত্তর কোরিয়ার প্রচারণারও একটি অংশ। দীর্ঘ সফরের মাধ্যমে কিম পরিবার জনগণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা প্রদর্শনের চেষ্টা করে। ২০২২ সালে প্রচারিত এক ভিডিওতে দেখা যায়, কিম জং উন দেশজুড়ে ক্লান্তিকর ট্রেন সফরে অংশ নিচ্ছেন এবং ভুট্টাক্ষেত পরিদর্শন করছেন, যেটিকে সরকার ‘কমিউনিস্ট ইউটোপিয়া’ প্রচারের অংশ হিসেবে তুলে ধরে।

সূত্র: রয়টার্স

ইত্তেফাক/টিএইচ