বিস্ময়করভাবে কাতারের রাজধানী দোহায় মঙ্গলবার বিকালে হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর ইসরাইলের বিমান হামলা করেছে। এই হামলা গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে নতুন করে এক ঝাঁকুনি দিয়েছে, বলা যায়, অস্থির করে তুলেছে। হামলার পরমুহূর্তেই ধোঁয়ায় ঢেকে যায় ওয়াদি রাওদান স্ট্রিটের উকোড পেট্রোল স্টেশনের পাশের বনেদি আবাসিক এলাকা। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে, ৭ অক্টোবরের 'নৃশংস গণহত্যা'র জন্য দায়ী হামাস নেতাদের লক্ষ্য করেই এই 'নির্ভুল হামলা' চালানো হয়। কিন্তু কাতারের সার্বভৌমত্বকে আঘাত করে এই সামরিক অভিযান কেবল একটি দেশের ওপর আক্রমণ নয়, বরং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
কাতার ১৯৯৬ সালে ইসরাইলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিল, যা ওমানের পর আরব উপদ্বীপের দ্বিতীয় দেশ হিসেবে পরিচিতি দেয়। এই সম্পর্ক ইসরাইল-জর্দান শান্তিচুক্তির সঙ্গে একযোগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবু ২০১২ সালের পর থেকে কাতার হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোকে আশ্রয় দিয়ে এসেছে এবং গোপনীয় কূটনৈতিক আলোচনার অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। আমরা দেখেছি যে, দোহা ছিল ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে বহুবারের যুদ্ধবিরতির গোপন দরকষাকষির নির্ভরযোগ্য স্থান। কিন্তু মঙ্গলবারের হামলা সেই ভূমিকাকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে। ইসরাইলি সামরিক সূত্রে জানা যায়, ১৫টি যুদ্ধবিমান থেকে ১০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে হামাসের শীর্ষ নেতৃত্বকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। ফুটেজে দেখা যায়, দোহার পশ্চিম ল্যাঞ্জন জেলার পাশে একাধিক ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে।
হামাস জানিয়েছে, নিহতদের মধ্যে রয়েছেন হুমাম আল-হাইয়া, জিহাদ লাবাদ, আব্দুল্লাহ আবদুল ওয়াহিদ, মুয়ামেন হাসসৌনা, আহমেদ আল-মামলুক এবং কাতারি নিরাপত্তা বাহিনীর করপোরাল বদর সাআদ মোহাম্মদ আল-হুমাইদি। যদিও হামাসের প্রধান আলোচক খালিল আল-হাইয়া ও নির্বাসিত নেতা খালেদ মাশাল হামলার সময় ঐ ভবনে ছিলেন বলে গুজব রয়েছে, তবে এখনো তাদের ভাগ্য সম্পর্কে স্পষ্ট কোনো তথ্য মেলেনি। হামাসের দাবি, ইসরাইলের হামলা শান্তি আলোচনার বিরুদ্ধে এক স্পষ্ট বার্তা, কারণ 'নেতানিয়াহুর সরকার কোনোভাবেই আলোচনায় আগ্রহী নয়।'
তাৎক্ষণিকভাবে কাতার হামলাকে 'উসকানিমূলক, বেআইনি এবং সার্বভৌমত্বের ওপর সরাসরি আঘাত' হিসেবে অভিহিত করেছে। কাতারের আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি ইসরাইলকে হামলার পরিণতির জন্য দায়ী করেছেন এবং কাতারের জনগণের পাশে দৃঢ়ভাবে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। বাংলাদেশও এ হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, এই হামলা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বাংলাদেশ দৃঢ়ভাবে কাতারের সরকার ও জনগণের পাশে রয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, 'আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে জাতিসংঘ ও সংশ্লিষ্ট অংশীদারদের আহ্বান জানাচ্ছি, যাতে তারা ইসরাইলের এই বেআইনি কর্মকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত করে এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা সুরক্ষিত রাখে।' ঢাকার মতে, এই হামলা 'আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক শান্তি ও প্রতিষ্ঠিত আন্তর্জাতিক রীতিনীতির প্রতি ইসরাইলের অব্যাহত অবজ্ঞার আরেকটি প্রমাণ।'
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি সার্বভৌম দেশের ভেতরে সরাসরি সামরিক হামলার ঘটনা আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। বিশ্বের অনেক প্রভাবশালী দেশ-যেমন জার্মানি, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, চীন, ও রাশিয়া বিভিন্ন মাত্রায় ইসরাইলের এই পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেছে। বলা যায়, শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলির নিন্দা ইসরাইলকে আন্তর্জাতিক ঝড়ের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইসরাইলের দৃঢ় মিত্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানিয়ে বলেন, কাতারে হামাস নেতৃত্বের ওপর ইসরাইলের হামলার ঘটনায় তিনি 'পুরো পরিস্থিতি নিয়ে খুব বেশি সন্তুষ্ট নন।' তিনি আরো জানান, এ ঘটনার বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ বিবৃতি দেবেন। ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, এই হামলা গাজায় যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার নাজুক প্রচেষ্টাকে বিপদের মুখে ফেলতে পারে। দীর্ঘদিনের মিত্র জার্মানি একে 'অগ্রহণযোগ্য' ঘোষণা করেছে। ভারত, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ কূটনৈতিক অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে, 'গভীর উদ্বেগ' প্রকাশ করে আঞ্চলিক উত্তেজনা বৃদ্ধির সতর্কতা দিয়েছে।
তবে এই সমালোচনা কতটা কার্যকর হবে, সেটি নিয়ে গভীর সংশয় রয়েছে। রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো এইচ এ হেলিয়ার মন্তব্য করেছেন, 'ইসরাইলের যুদ্ধনীতি স্পষ্টতই গাজায় ধ্বংসযজ্ঞসহ ৬৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনিকে খুন এবং লেবানন, সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরান ও তিউনিসিয়ার সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু এখনো ইসরাইলের দিক থেকে এসব থামাতে বড় কোনো পরিবর্তন ঘটেনি, এবং এই ঘটনাতেও তা হওয়ার সম্ভাবনা নেই।' বাস্তবতা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদ লঙ্ঘন করেও ইসরাইল বারবার দণ্ডমুক্তি পাচ্ছে, আর বিশ্বশক্তিগুলোর নীতি প্রায় অপরিবর্তিত থেকে যাচ্ছে।
৭ অক্টোবর ২০২৩ সালের হামলার পর থেকে হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যে অঘোষিত মধ্যস্থতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল কাতার, সেই ভূমিকা এখন বিপন্ন। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু এই হামলাকে 'ন্যায্য ও যৌক্তিক' বলে ঘোষণা করেছেন। তার দাবি, হামাস ৭ অক্টোবর ইসরাইলে ১ হাজার ২০০ মানুষ হত্যার নেতৃত্ব দিয়েছে এবং ২৫০ জনকে জিম্মি করেছে। অন্যদিকে, হামাস বলছে, এই হামলা আসলে শান্তি আলোচনাকে ব্যাহত করার কৌশল। কাতারের মধ্যস্থতাকারী ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হলে যে কোনো নতুন যুদ্ধবিরতি চুক্তি অসম্ভব হয়ে পড়তে পারে।
প্রশ্ন এখন একটাই, এই আক্রমণ কি কেবল একটি নতুন সংঘাতের সূচনা, নাকি আন্তর্জাতিক কূটনীতি আবারও তার ইতিবাচক গতি হারাচ্ছে? বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাস্তবতা সম্ভবত আরো জটিল। ইসরাইলের দোহায় হামলা শুধু কাতার-ইসরাইল সম্পর্ককে সংকটে ফেলে দেয়নি; বরং পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিকে নতুন করে সাজিয়ে দিচ্ছে। হামাস নেতৃত্বের ওপর আঘাত ইসরাইলের দীর্ঘমেয়াদি নীতি নির্দেশ করছে, যেখানে আলোচনার চেয়ে শক্তি প্রয়োগই মুখ্য হাতিয়ার। এই পরিস্থিতি হামাসকে আরো চরমপন্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে, যা সংঘাতকে সীমিত রাখার পরিবর্তে আঞ্চলিক যুদ্ধের রূপ দিতে পারে।
প্রসঙ্গত বলা দরকার, বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া কূটনৈতিক হলেও কার্যকর পদক্ষেপের অভাবই ইসরাইলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির মতো মিত্র দেশগুলো প্রকাশ্যে অসন্তোষ জানাচ্ছে, অন্যদিকে তারা সামরিক সহযোগিতা বা অস্ত্র বিক্রয় বন্ধে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে না। ভারতও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, তবে তার নীতি কৌশলগতভাবে ভারসাম্যপূর্ণ, যাতে ইসরাইল ও উপসাগরীয় রাষ্ট্র উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্ক বজায় থাকে। এসব দেশের এই দ্বৈত অবস্থান ইসরাইলের আগ্রাসনকে আরো উসকে দিচ্ছে।
আন্তর্জাতিক কূটনীতির অকার্যকারিতা এখানে স্পষ্ট। জাতিসংঘের বিবৃতি ও প্রস্তাবগুলো বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের অভিযোগগুলিও কার্যকর প্রভাব ফেলতে পারছে না। হামাসকে দুর্বল করার নামে কাতারের ভেতরে হামলা চালিয়ে ইসরাইল একটি নজির তৈরি করেছে, যা ভবিষ্যতে অন্য দেশগুলোর জন্যও বিপজ্জনক উদাহরণ হতে পারে। এতে আঞ্চলিক প্রতিরক্ষানীতিতে নতুন করে অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরুর আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে।
সবচেয়ে বড় শঙ্কা, এই হামলা কেবল গাজা সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করবে না, বরং লেবানন, ইরান, ইয়েমেন এবং উপসাগরীয় অঞ্চল জুড়ে নতুন সংঘাতের আগুন ছড়িয়ে দিতে পারে। ইসরাইলের এই আগ্রাসী কৌশল যদি নিয়ন্ত্রণহীন থেকে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য এক দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে যাবে। সুতরাং এমন এক কুটিল পরিস্থিতিতে যে উত্তরই আসুক, এ কথা স্পষ্ট যে মধ্যপ্রাচ্য আরো এক অনিশ্চিত, বিস্ফোরক এবং কূটনৈতিকভাবে অচলাবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। দোহায় এই হামলা হয়তো এই মুহূর্তে ইসরাইলের সামরিক সাফল্য, কিন্তু এর প্রতিক্রিয়ার অভিঘাত আগামী দশকের জন্য আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শান্তি প্রচেষ্টাকে গভীর সংকটে ফেলে দিতে পারে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কবি ও কথাসাহিত্যিক
