সুন্দর শব্দগুচ্ছ 'লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড'! তিনটি শব্দই ইংরেজি; কিন্তু আমরা যাহারা উন্নয়নশীল বিশ্বে বসবাস করি, তাহারা এই শব্দগুচ্ছ সম্পর্কে অনেকটাই সচেতন। কেননা এই সকল দেশে ইহা একটি সাধারণ সমস্যা। মহাসমস্যা বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। ডায়াবেটিস, প্রেশারসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি অসংক্রামক যেই সকল রোগ আমরা আমাদের দেহে পুষিয়া থাকি, এই সমস্যা তাহার চাইতে কম নহে। ইহাতে আমরা কেবল ভুগিতে থাকি, নিরাময় হয় না। রোগ লইয়াই বসবাস করিতে হয়। এই সকল জটিল রোগের যেমন কোনো কার্যকর দাওয়াই নাই, তেমনি তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহ হইতে লেভের প্লেয়িং ফিল্ড সমস্যার কোনো সমাধান আছে বলিয়া মনে হয় না।
অথচ উন্নত দেশে এই সমস্যা কোনো সমস্যাই নহে। নির্বাচনের আগেভাগে সেইখানে কেহ বলেন না যে, নির্বাচনি মাঠ এবড়োখেবড়ো বিধায় তাহা সমান করিতে হইবে। আর তৃতীয় বিশ্বের দেশের নির্বাচনি মাঠ এতটাই অসমান যে তাহা সমান করিতে হইলে বুলডোজার লাগিবে। এই জন্য এই সকল দেশে অস্থিরতা লাগিয়া থাকে এবং একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর সেনাশাসন বা তত্ত্বাবধায়ক নামে ভিন্ন সরকারকে দায়িত্ব লইতে হয়; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাহারাও স্থায়ীভাবে এই সমস্যার কোনো কূলকিনারা করিতে পারেন না বলিয়া একসময় আবার লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের দাবি উঠে। যেই হেতু উন্নয়নশীল দেশসমূহে এই সমস্যাটি চক্রাহারে চলিতে থাকে, তাই এই কথাটিও বিশেষ গুরুত্ববহ বইকি।
সোজা ভাষায় লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অর্থ হইল, খেলার মাঠ যেমন সমতল হয়, তেমনই রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ময়দানও সকল প্রার্থীর জন্য সমান এবং নিরপেক্ষ হইতে হইবে। কোনো একটি দল বা প্রার্থীর প্রতি বিশেষ পক্ষপাতিত্ব বা বৈষম্য করা চলিবে না। সকল প্রার্থীর জন্য নির্বাচনি আচরণবিধি, সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপত্তা সমানভাবে নিশ্চিত করা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের মূল লক্ষ্য। কেননা গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি হইল সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন। এই নির্বাচন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জনগণ তাহাদের পছন্দের প্রতিনিধিকে ভোট দিয়া নির্বাচিত করিতে পারে। যদি নির্বাচনের ময়দানই অসমান হয়, তাহা হইলে এই প্রক্রিয়াটি কি অর্থহীন হইয়া যায় না? লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অনুপস্থিতিতে দুর্বল বা বিরোধী দলগুলির জন্য প্রচার চালানো, ভোটারদের নিকট পৌঁছানো এবং ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা অত্যন্ত কঠিন হইয়া পড়ে। ক্ষমতাশীল দল বা ব্যক্তিরা প্রশাসনিক এবং আর্থিক সুবিধা ব্যবহার করিয়া অনায়াসে নিজেদের পক্ষে জনমত প্রভাবিত করিতে পারে। তাই লেভেল প্লেয়িং না থাকাটা গণতন্ত্রের মূল চেতনার পরিপন্থি।
এই জন্য রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল (১৮০৬-১৮৭৩) গণতন্ত্রের সাফল্যের জন্য জনমত গঠন এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতার উপর জোর দেন। তাহার মতে, যদি কোনো একটি মতবাদকে কৃত্রিমভাবে দমন করা হয়, তাহা হইলে সমাজের অগ্রগতি ব্যাহত হয়। লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের অভাবও একই ধরনের দমনমূলক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। মার্কিন ও আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট এ ডাহল তাহার polyarchy (পলিআর্কি) নামক ধারণায় রাজনৈতিক অংশগ্রহণের স্বাধীনতা এবং প্রতিযোগিতার গুরুত্বের কথা বলিয়াছেন। তাহার মতে, একটি দেশে যত বেশি রাজনৈতিক দল এবং প্রার্থী অবাধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে পারিবে, সেই দেশটি তত বেশি গণতান্ত্রিক হইবে; কিন্তু লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড না থাকিলে গণতন্ত্রের কাঠামো দুর্বল হইয়া পড়ে এবং নানান সমস্যার সৃষ্টি হয়। ইহার ফলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস পায়। জনগণ ভোটদানের আগ্রহ হারায়, কারণ তাহারা মনে করে যে, তাহাদের ভোট কোনো পরিবর্তন আনিতে পারিবে না। ইহাতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা ও ক্ষমতাসীন দলের একনায়কসুলভ মনোভাব বৃদ্ধি পায়। ইহাতে ব্যাহত হয় দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও অগ্রগতি।
অতএব, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড থাকাটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ; কিন্তু নির্বাচনের মাঠ আমরা কীভাবে সমান করিব? এই জন্য প্রথমত, দরকার একটি নিরপেক্ষ ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন। দ্বিতীয়ত, প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করিতে হইবে ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করিতে হইবে। ইহার পর নির্বাচনকালীন ক্ষমতার অপব্যবহার বন্ধ করিতে হইবে। আমরা পরামর্শ দিয়াই খালাস; কিন্তু ইহার বাস্তবায়ন করিবেন কে?
