ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার হাওর অঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রাম রাজাপুর। এখানে শিক্ষার জন্য উচ্চ বিদ্যালয় ও স্বাস্থ্য সেবার জন্য ক্লিনিক ছিল স্বপ্নের মতো। কিন্তু সেই স্বপ্ন আজ বাস্তবে পরিণত হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে গ্রামেরই এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের কারণে। বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে তারা এলাকায় স্থাপন করেছে স্কুল ও ক্লিনিক।
মা আনোয়ারা বেগম এবং বাবা জামির উদ্দিনের নামে স্কুল ও ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করে এলাকার মানুষের জীবনযাত্রা উন্নয়নের কাজ করে যাচ্ছে ওই পরিবার। ওই দম্পতির পাঁচ ছেলে ও চার মেয়ে। তারা সবাই উচ্চশিক্ষিত ও পারিবারিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। বাবা-মায়ের রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে তারা একটি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি ক্লিনিকও নির্মাণ করেছেন, যেটি এলাকার মানুষের বেশ উপকারে আসছে। একটি মাদ্রাসা করারও পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এসবের খরচ চালানো হচ্ছে পারিবারিকভাবে।
আনোয়ারা বেগম ছিলেন শিক্ষানুরাগী, তিনি এলাকার এলাকার শিশুদের পড়াশুনার ব্যাপারে মনোযোগী হন, এলাকায় পরিচিত পান ‘মাস্টার মা’ হিসেবে। সেই মাস্টার মা এখন বেঁচে নেই। তবে তার সন্তানরা মায়ের ইচ্ছা পূরণ করেছেন। ২০২০ সালে আনোয়ারা জামির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে ২০২৪ সাল থেকে এর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
আনোয়ারা জমির উদ্দিন বিদ্যালয়ে বর্তমানে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে ১০০ এর বেশি শিক্ষার্থী রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি এমপিওভুক্তকরণসহ এর উন্নয়নে যেন সরকার নজর দেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলার আশুগঞ্জ উপজেলার নৌকাঘাট থেকে রাজাপুর গ্রামে নৌকায় করে যেতে হয়। প্রায় দুই ঘণ্টার পথ। সড়কের বেহাল দশার কারণে নৌপথই এখন একমাত্র অবলম্বন। গ্রামটিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষের বসবাস। সেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও উচ্চবিদ্যালয় ছিল না। পাশের উচ্চবিদ্যালয়ে যেতে শিক্ষার্থীদের অন্তত একঘণ্টা হাঁটতে হতো। এখন গ্রামেই উচ্চবিদ্যালয় হওয়ার শিক্ষার আলো পাচ্ছে গ্রামবাসী।
রাজপুর গ্রামের তপন কুমার দাস বলেন, ‘পড়াশুনার উন্নতির পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বাল্যবিবাহরোধে বিদ্যালয়টি ভূমিকা রাখছে। কেননা, আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার পরই মেয়েদেরকে বিয়ে দিয়ে দিত। এখন মেয়েদেরকে বিদ্যালয়ে পাঠাতো আগ্রহী হয়ে উঠেছে।’
আনোয়ারা জামির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আফজাল হোসেন বলেন, ‘গত বছর ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। এখন ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে ১০০ এর বেশি শিক্ষার্থী আছে। সরকার যদি বিদ্যালয়টির দিকে নজর দেয় তাহলে অনেক উপকার হবে।’
বিদ্যালয়ের কিছু দূরেই নির্মাণ করা হয়েছে একটি ক্লিনিক, সেখানে দেওয়া হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা। সেখানে প্রসূতি মায়েদের জন্য নরমালি ডেলিভারির ব্যবস্থা করা হয়েছে। ক্লিনিক থেকে বিনামূল্যে ওষুধও দেওয়া হয়।
ক্লিনিকটিতে গিয়ে দেখা যায়, অন্তত ৩০-৪০ জন রোগী সেবা নিতে অপেক্ষা করছেন। ভেতরের একটি কক্ষে এক বৃদ্ধাকে অক্সিজেন লাগিয়ে শুইয়ে রাখা হয়েছে। এক শিশুকে নেবুলাইজ করা হচ্ছে। অনেকে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করছেন। কেউ কেউ স্বাস্থ্য কার্ড দেখিয়ে ওষুধ নিচ্ছেন।
অজুফা নামে এক সেবাপ্রার্থী বলেন, ‘এই ক্লিনিক হওয়াতে আমাদের উপকার হয়েছে। আর্মি অফিসার (ব্রিগেডিয়ার জেনারেল) মনিরুল হক স্যার ফোনে কল দিয়ে মাঝে মাঝে রোগী দেখেন। এলাকায় এলেও রোগী দেখে যান। ওনার পরিবারের পক্ষ থেকেই এটা করা হয়েছে।’
ক্লিনিকের দায়িত্বরত সেবিকা সুলতানা রেজিয়া বলেন, ‘আমি নিয়মিতই এখানে সেবা দেই। নরমাল ডেলিভারি করানোর জন্য আমাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা হয়েছে। গত মাসে একটি নরমাল ডেলিভারি করেছি। এলাকার মানুষের বেশ উপকার হচ্ছে এ ক্লিনিকের মাধ্যমে।’
উদ্যোক্তা পরিবারের সদস্য জামির উদ্দিন ও আনোয়ারা বেগমের সন্তান প্রকৌশলী মো. হামিদুল হক বলেন, ‘বিদ্যালয়ের জন্য ৯০ শতাংশের বেশি জায়গা দেওয়া হয়েছে। মূলত মায়ের ইচ্ছা পূরণের আমাদের পরিবার গ্রামের শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির কথা চিন্তা করেছে। বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে বিদ্যালয়ের পাশাপাশি এখন একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার চিন্তা রয়েছে।’
মো. হামিদুল হক বলেন, ‘আমাদের এলাকাটি নানাভাবে অবহেলিত। বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য আমরা চেষ্টা করছি এখানকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবা নিয়ে কিছু করতে। আমাদের পরিবারের সবাই এ নিয়ে একমত বিধায় সবকিছু করতে সহজ হচ্ছে।’
