সম্প্রতি বিবিসি, সিএনএন, এবিসি, রয়টার্সসহ খ্যাতনামা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম একটি মজার ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ ছবি, ভিডিও ও ‘সংবাদ’ প্রকাশ করিয়াছে। উহা নিজেদের তৈরি নহে; কিন্তু ঐ ছবি ভিডিও একটি অর্থ বা বার্তা বহন করিতেছে। ভাদিম মখোরভ নামের একজন ট্রাভেল ব্লগার রাশিয়ার কোলিউচিন দ্বীপে ড্রোন ক্যামেরা উড়াইতে থাকিলে দেখিতে পান একটি পরিত্যক্ত বাড়ির মধ্যে কয়েকটি পোলার বেয়ার বা শ্বেতভল্লুক ঘোরাফিরা করিতেছে এবং উহারা ঐখানেই বসবাস করিতেছে।
এই বাড়িটি ছিল একসময়ের সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি গবেষণা কেন্দ্র। অনুমান করিতে মোটেই কষ্ট হয় না যে, ঐ বাড়ির নিরাপত্তা এবং যত্নের স্বার্থে একসময় সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রয়োজন হইলে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করিতেও কুণ্ঠিত হইত না; কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙিয়া যাইবার পর বাড়িটি পরিত্যক্ত হয় এবং আজ তাহা ভল্লুকের বাড়িঘরে পরিণত হইয়াছে!
ইহা হইতে শিখিবার আছে। যদিও মানুষ সহজ শিক্ষাটা কখনোই গ্রহণ করে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে দৌড়ায়, গবেষণাগারে যায় কঠিন জটিল শিক্ষা গ্রহণ করিবার জন্য। সহজ ও বাস্তব শিক্ষার উদাহরণ কী আমাদের হাতে কম কিছু রহিয়াছে? দেশের আনাচকানাচ আজও অনেক বিশাল পুরাতন অট্টালিকা দেখিতে পাওয়া যায়, যাহা একসময় ছিল দুর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদার বা মহারাজাদের।
এই সকল বাড়ি আজ সুনসান অশতিপর বৃদ্ধের ভাঙা-ক্ষয়প্রাপ্ত দন্তের মতো দাঁড়াইয়া আছে। ইহার কিছু সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের হাতে গিয়াছে, যেইখানে ছাগল-গরু বিশ্রাম গ্রহণ করে। একসময়ের জৌলুস, সমৃদ্ধি ঠিকরাইয়া পড়া প্রাসাদের মতো অন্য কিছু বাড়িতে এখন তৃতীয় বা চতুর্থ প্রজন্মের হতদরিদ্র প্রজন্ম বসবাস করিতেছে। জানালা ভাঙিয়া গিয়াছে, আস্তরণ খুলিয়া পড়িয়াছে, ভবনের হাড়গুলি দেখা যাইতেছে; কিন্তু সংস্কারের কাহারো সাধ্য নাই।
ইহা আমাদের কী শিক্ষা দেয়? যেন ভবনগুলি দাঁড়াইয়া পরিষ্কার বলিতেছে, সকল কিছুরই শেষ আছে, কোনো কিছুই অবিনশ্বর নহে। অতি দুঃখের বিষয় এই শিক্ষা আমাদের জীবনের কোথাও প্রতিফলিত হয় না। অর্থাৎ শিক্ষাটাই আমরা গ্রহণ করি না। করিলে দেশ ও জাতির ভাগ্য অন্যরকম করিয়া লেখা হইত। ব্যক্তি হইতে সিংহাসন-সর্বত্র হিসাবনিকাশ পালটাইয়া যাইত, মানুষের মধ্যে এত অস্বস্তি, এত আতঙ্ক, আশঙ্কা, নিরাপত্তাহীনতা থাকিত না।
আজকের জৌলুস যে ভবিষ্যতের জন্য গ্যারান্টেড নহে ইহা বুঝিলেই মানুষের বাস্তসম্মত চিন্তা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ সহজতর হইত। আর্থার শপেনহাওয়ার, ‘Change alone is etemal, perpetual, immortal’। ইহাই যেন কেহ মনে রাখিতে চাহে না। বড় বড় ধর্মও আমাদেরকে এই শিক্ষাই গ্রহণ করিতে বলিয়াছে। মানুষের জীবন, অথবা ক্ষমতার কথা না হয় বাকিই থাকুক, এই যে ইট-কাঠের তৈরি ভবন, প্রাসাদ তাহাও বিলীন, নিষ্প্রভ, অন্ধকারাচ্ছান্ন হইয়া যায় সময়ের স্রোতোধারায়। অথচ অতি নগণ্য সময়ের জন্য একটি অবস্থানে উঠিয়া আমরা অন্ধের মতো আচরণ করিতে দেখি মানুষকে।
বিশেষ করিয়া, তৃতীয় বিশ্বের দেশসমূহে ইহার প্রাদুর্ভাব লক্ষ করা যায়। তাহারা মানির মান রক্ষা করিতে ভুলিয়া যান, উচিত কাজকে উপেক্ষা করিয়া অনুচিত, অন্যায় শক্তিপ্রয়োগে মত্ত হইয়া উঠেন। অথচ চর্মচক্ষু মুদিয়া একটু চিন্তা করিলেই দিব্য চক্ষু খুলিয়া যাইতে পারে। উন্নয়নশীল দেশে যাহারা ক্ষমতায় যান, তাহারা কেন জানি ভাবিয়া বসেন, এই চেয়ার চিরস্থায়ী। আজ অবধি কোনো মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এই বিশেষ মানসিক রোগের কারণ ও উৎস সম্পর্কে কিছু ব্যাখ্যা করিয়াছেন বলিয়া আমাদের জানা নাই। সুতরাং সকলেরই উচিত, ‘সকল কিছুরই শেষ আছে’- কথাটি মাথায় রাখিয়া সামনের দিকে পদচালনা করা। তাহা না হইলে যে কোনো মুহূর্তে পা ফসকাইয়া যাইতে পারে।
