'হায় চিল, সোনালী ডানার চিল, এই ভিজে মেঘের দুপুরে তুমি আর কেঁদো নাকো উড়ে-উড়ে ধানসিড়ি নদীটির পাশে! জীবনানন্দ দাশ এ কবিতায় বিরহের স্মৃতি হৃদয় খুঁড়ে না জাগানোর আকুতি জানিয়েছেন। চিলের কান্নায় বেদনার সুর ঝরুক আর না ঝরুক বাংলার এ শিকারি পাখি আজ অস্তিত্বসংকটে। সবুজ গাছপালার মগড়ালে এদের হাঁকডাক শোনা যায় না। অসীম নীল আকাশ জুড়ে দলবেঁধে ওড়াউড়ি করতেও দেখা যায় না। কবিতা আর গল্পেই এদের নিয়ে উচ্ছ্বাস দেখা যায়।
পাখি বিশারদ শরীফ খান বাংলায় তিন ধরনের চিলের কথা বলেছেন। শঙ্খচিল, ভুবনচিল ও সাদা চিল। আমরা এখানে শঙ্খচিলের কথাই বলতে চাই। এর ইংরেজি নাম ব্রামিয়নি কাইট। আবাসিক পাখি। বুক, পেটের কিয়দংশ এবং কপাল সাদা। অল্প বয়সি চিলের পিঠ ও ডানা খয়েরি এবং বুকের সাদা অংশ মলিন। ইংরেজি চিল শব্দার্থ শান্ত বা ঠান্ডা। কিন্তু এটি শান্ত বা ঠান্ডা নয়; শিকারি পাখি। সুযোগসন্ধানী। নিষ্ঠুরতা স্বভাবজাত। শঙ্খচিলের প্রধান খাবার মাছ। এছাড়াও সাপ, কুঁইচা, হাঁসমুরগির ছানা, ব্যাঙ, কাঁকড়া বা ছোট প্রাণী প্রিয় খাবার। ভরা পেটে মনের সুখে ট্যাঁ ট্যাঁ টি-উ টি-উ সুর তুলে ডাকে। চিলের ডাকে আড়াজঙ্গলের নীরবতা ভাঙে। জীবনানন্দ দাশ শঙ্খচিলের এ ডাককে বিরহের যন্ত্রণা বলেছেন। এর ডানা বেশ দীর্ঘ। তবে পা খাটো। আর দৃষ্টিশক্তি অনেক প্রখর।
শঙ্কচিলের শিকার খোঁজার স্টাইলও বেশ মজার। অনেক উঁচু থেকে এরা কাঙ্ক্ষিত শিকার দেখতে পায়। শিকারের খোঁজে এরা আকাশে ডানা মেলে বিমানের মতো চক্কর খায়। তারপর চোখের পলকে ছোঁ মেরে দুই পায়ের নখরে শিকার কবজা করে। এরপর দ্রুত চম্পট দিয়ে আশপাশের বড় গাছের ডালে রাজকীয় ভঙ্গিমায় বসে। জীবন্ত প্রাণীকে নখের আঁচড়ে ছিন্নভিন্ন করে আস্তে আস্তে খায়। যেন কোনো তাড়া নেই। সম্প্রতি ঢাকার মিরপুরে পাখির হাটে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, সেখানে চিলের বাচ্চা বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি মানের শঙ্খচিল ৪ থেকে ৫ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। বন্যপ্রাণী আইনে এসব পাখি বিকিকিনি নিষিদ্ধ হলেও মানা হচ্ছে না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং পাখিবিশেষজ্ঞ ড. ফিরোজ জামান বলেন, 'শঙ্খচিল শিকারি পাখি। এরা জলাশয়ের ধারে উঁচু আম, জাম, শিমুল বট-পাঁকুড়গাছে খড়কুঁড়ো ও শুকনা ডালপালা বিছিয়ে বাসা বাঁধে। তিন-পাঁচটি ডিম দেয়। দুই/তিনটি বাচ্চা ওঠায়। এপ্রিল-জুলাই প্রজনন মৌসুম।' তিনি আরো বলেন, 'শঙ্খচিলের প্রধান খাবার মাছ। সিলেট ও নেত্রকোনার হাওর, বাঁওড় এবং উত্তরবঙ্গের যেসব স্থানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাছ চাষ হয়, সেখানে আনাগোনা বেশি। এরা জলাশয়ের রোগাক্রান্ত ও মরা মাছ খেয়ে রোগব্যাধি নিয়ন্ত্রণ করে। ছোটখাটো প্রাণী খেয়ে প্রকৃতির খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা করে। এজন্য এরা প্রকৃতির বিশ্বস্ত বন্ধু হিসেবে স্বীকৃত।'
টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার সৌখিন ফটোগ্রাফার কামাল হোসেন বলেন, 'গ্রামাঞ্চলে বড় গাছ-গাছালি কমে যাওয়ায় চিল তথা সব ধরনের শিকারি পাখির আবাসন ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। টাঙ্গাইলের বিলঝিল ও জলাশয়ে শঙ্খচিল দেখাই যায় না। বহু খোঁজাখুঁজির পর দিন কয়েক আগে ঘাটাইল উপজেলার ডাকাতিয়া বিল থেকে একটি কিশোর শঙ্খচিলের ছবি তুলতে সক্ষম হন তিনি।'
টাঙ্গাইলের লোকসাহিত্যবিষয়ক গবেষক মামুন তরফদার জানান, একসময়ে কবিতা, গান ও লোকসাহিত্যে চিলের সমুজ্জ্বল উপস্থিতি ছিল। কিন্তু বনজঙ্গল ও উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের বিনাশ ঘটায় জীবনানন্দ দাশের কবিতার শঙ্খচিলের খুব একটা দেখা মেলে না।
