কেঁচো সার বিক্রি করে স্বাবলম্বী রওশন আরা

আপডেট : ১২ অক্টোবর ২০২৫, ১৩:৫৮

খুলনার দাকোপ উপজেলার জয়নগর গ্রামের এক অজপাড়াগাঁয়ে, নিভৃতে স্বপ্ন বুনছেন এক নারী রওশন আরা বেগম। একসময় সংসারের টানাপোড়নে জর্জরিত এই নারী এখন স্বাবলম্বী, আত্মবিশ্বাসী। তার হাতে উঠে এসেছে মাটির গন্ধ, জীবনের আশার আলো। তিনি এখন ‘কেঁচো সার’ বা ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদন করে নিজের ভাগ্য বদলে ফেলেছেন।

রওশন আরার বাড়িতে গেলেই চোখে পড়ে একচালা টিনের ঘর, ঘরের ভেতর সারি সারি পাত্রে মাটির গন্ধ আর জীবন্ত কেঁচোর চলাচল। পাকা দুইটি হাউজ, ১২টি মাটির চাড়ি আর ১৫০টি রিং স্ল্যাবে তিনি উৎপাদন করেন এই পরিবেশবান্ধব জৈব সার। উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করেন গোবর, কচুরিপানা ও কলাগাছের কুচি- সবই প্রাকৃতিক। প্রতিটি পাত্রে ১৫ থেকে ২০ কেজি, আর বড় হাউজে প্রায় পাঁচ মন সার উৎপাদিত হয়। তার খামারে এখন কেঁচোর নিজস্ব বংশবিস্তার হচ্ছে, তাই বাইরের কেঁচোর প্রয়োজনও পড়ে না।

২০০৯ সালে বেসরকারি সংস্থা ‘উল্লাসী সৃজনী সংঘ’-এর প্রশিক্ষণ নিয়ে শুরু হয় তার এই পথচলা। পরে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর ও এনজিও জে.জে.এস থেকে আরও প্রশিক্ষণ নেন তিনি। ২০১১ সালে প্রথম যখন কেঁচো সার তৈরির কাজ শুরু করেন, তখন ছিল নানা সমস্যা, আর্থিক অনটন, উপহাসও। কিন্তু এখন তার খামার দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসে। মাসে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা আয় করেন তিনি কেঁচো সার বিক্রি করে। প্রতি কেজি সার তিনি খুচরা ২৫ টাকা আর পাইকারি ২০ টাকায় বিক্রি করেন।

রওশন আরা বলেন, ‘প্রথমে গোবর আর কচুরিপানা মিশিয়ে রাখি ৮-১০ দিন, তারপর কেঁচো দিই। এক মাসের মধ্যে তৈরি হয় জৈব সার। এই সারে গাছ যেমন ভালো হয়, তেমনি মাটিও উর্বর থাকে। এখন আমার খামারে প্রায় এক লাখ টাকার মতো সার মজুদ আছে।’

তিনি শুধু নিজে উৎপাদনেই থেমে নেই, এখন বিভিন্ন এনজিও যেমন জে.জে.এস ও ব্র্যাকের প্রশিক্ষণ কর্মশালায় গিয়ে শেখান অন্যদেরও। প্রতিটি প্রশিক্ষণের জন্য পান ১৫০০ টাকা সম্মানী। তিনি বলেন, ‘আমি চাই নারীরা আমার মতো এগিয়ে আসুক। কম পুঁজিতে এই কাজ দিয়ে খুব সহজেই সংসারের ভার সামলানো যায়।’

স্থানীয় কৃষক কামাল গাজি জানান, ‘রওশন আরার তৈরি কেঁচো সার আমি আমার সবজি খেতে ব্যবহার করি। ফলন ভালো হয়, গাছ তাজা থাকে, আর রাসায়নিক সার লাগেই না। দামও কম।’

ব্র্যাকের কালিনগর শাখার ব্যবস্থাপক প্রশান্ত কুমার সরকার বলেন, ‘ব্র্যাকের আল্ট্রা পুওর প্রোগ্রামের আওতায় দাকোপে ৩০ জন নারীকে ভার্মি কম্পোস্ট উৎপাদনের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। রওশন আরা তাদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস। তার নেতৃত্বে অনেক নারী আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন।’

দাকোপ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘জৈব সারই মাটির প্রাণ ফিরিয়ে আনে। রওশন আরার মতো নারীরা শুধু নিজেরাই স্বাবলম্বী হচ্ছেন না, সমাজেও ছড়াচ্ছেন পরিবেশবান্ধব কৃষির বার্তা। আমরা তাদের সহযোগিতা করছি এবং নতুনভাবে কমিউনিটি পর্যায়ে কেঁচো সার উৎপাদনের প্রকল্প নিচ্ছি।’

ইত্তেফাক/কেএইচ