সমাজে কয়েক দশক ধরিয়া এক অদ্ভুত বোধ ছড়াইয়া পড়িয়াছে-সৎ থাকিলে টিকিয়া থাকা যায় না। মানুষ যেন ইহাই সত্য বলিয়া মনে করিতেছে-জীবনযুদ্ধে জয়ী হইবার জন্য সোজা পথে চলা মানেই পরাজয়। ফলে 'চালাকি' এখন একপ্রকার জীবনদর্শন। যেইখানে যাহা পাওয়া যায়, লইয়া ফেলো-এই নীতিই আধুনিক সাফল্যের সূত্র বলিয়া মনে করা হইতেছে। অথচ এই 'চালাকির সংস্কৃতি'ই আমাদের জাতিসত্তাকে নিঃশেষ করিতেছে নিঃশব্দে।
চালাকি ও প্রজ্ঞার পার্থক্য অনেক সূক্ষ্ম, কিন্তু ফল বিপরীত। চালাকি মানুষকে ক্ষণস্থায়ী সুবিধা দেয়, প্রজ্ঞা দেয় দীর্ঘস্থায়ী উন্নতি। কোনো কোনো চালাক কর্মচারী কোনো প্রতিষ্ঠানের শিকড় পর্যন্ত খাইয়া ফেলিতে চাহে, কিন্তু ইহার বিপরীতে প্রাজ্ঞ কর্মচারীরা প্রতিষ্ঠানকে টিকাইয়া রাখিবার পথ খোঁজে। চালাক রাজনীতিকরা জনগণের চোখে ধুলা দিতে চাহে, প্রাজ্ঞ নেতা দেশের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখে। এইখানেই বুদ্ধিমত্তার প্রকৃত পরীক্ষা।
উন্নত বিশ্ব এই প্রজ্ঞাপথে হাঁটিয়াই উন্নত হইয়াছে। তাহাদের সমাজে কর্মক্ষেত্র মানে শুধু চাকরি নহে, একধরনের দায়বদ্ধতা। তাহারা প্রতিষ্ঠানকে আপন সত্তার সম্প্রসারণ বলিয়া ভাবে-যেইখানে নিজের সময়, শ্রম ও সততাকে সমান মর্যাদা দেয়, সেইখানেই শৃঙ্খলা একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। বহু ক্ষেত্রেই উন্নত বিশ্বের মানুষজনকে অনেক সময় আমাদের চোখে 'বোকা' বলিয়া মনে হয়। কারণ তাহারা কাজের বিনিময়ে প্রতারণা বা শর্টকাট পথ খোঁজে না। নিজের কর্মক্ষেত্র, প্রতিষ্ঠান কিংবা দেশের প্রতি তাহাদের দায়বদ্ধতা এমনই গভীর যে, ব্যক্তিগত স্বার্থ অনেক সময় ত্যাগ করিয়াও তাহারা নিয়মের পথ হইতে বিচ্যুত হয় না। একবার দায়িত্ব পাইলে তাহারা কাজটিকে নিজের জীবনের অংশ বলিয়া মনে করে। ফলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, প্রতিটি কাঠামো সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া স্থায়ী হয়। সেই কারণেই ইউরোপ-আমেরিকার শতবর্ষব্যাপী প্রতিষ্ঠানগুলি আজও অটল-তাহাদের ভিত গড়িয়া উঠিয়াছে কর্মনিষ্ঠা, নৈতিকতা ও পারস্পরিক আস্থার উপর। একটি গাড়ি যখন নিয়মে চলে, তখন তাহা দূর পর্যন্ত পৌঁছায়; কিন্তু বারবার দিক পরিবর্তন করিলে গন্তব্যে পৌঁছায় না-উন্নত বিশ্বের সাফল্যও মূলত এই 'নিয়ম' নামক চাকার উপর দাঁড়াইয়া আছে।
অপরদিকে তৃতীয় বিশ্বে, বিশেষত আমাদের সমাজে, প্রতিষ্ঠান মানে প্রায়শই যেন 'সুযোগের ক্ষেত্র'। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কর্মচারীদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান হইল সোনার ডিম পাড়া হাঁস, কিন্তু এই হাঁসটির পেট হইতে তৎক্ষণাৎই অধিক ডিম পাইতে তৃতীয় বিশ্বের অনেকেই নিজেকে চালাক মনে করিয়া হাঁসের পেট কাটিয়া ফেলিতেও দ্বিধা করে না। হাঁস মারা গেলে তাহাদের কী? তাহারা তো হাঁসের মালিক নহে। এই চিত্র সর্বত্র বিরাজিত।
এই মনোভঙ্গি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি করে না, নষ্ট করে জাতির আত্মসম্মান। কারণ, নৈতিকতার অভাব একবার সংক্রামিত হইলে তাহা আর থামে না। তখন ছোট কর্মচারী যাহা করে, বড় কর্মকর্তাও তাহার যুক্তি খোঁজে: ছোট চুরি যখন স্বাভাবিক হয়, বড় আত্মসাৎ তখন আর অপরাধ বলিয়া মনে হয় না। সমাজ ক্রমে এমন এক অবস্থায় উপনীত হয়, যেইখানে সততা বোকামি এবং অন্যায়-অসৎ কাজ হইল বুদ্ধিমত্তার পরিচয়! বস্তুত, একটি দেশের উন্নতির রহস্য অর্থে বা প্রযুক্তিতে নহে-মনস্তত্ত্বে। যে জাতির নাগরিকগণ নিজেদের দায়িত্বকে আত্মসম্মানের অংশ বলিয়া মানে, সেই জাতিই সভ্যতার শীর্ষে পৌঁছায়। উন্নত বিশ্ব বুদ্ধিমান হইল কীরূপে? তাহাদের শিক্ষায় বা সম্পদে নহে, তাহাদের মানসিকতাতেই উন্নত হইয়াছে। তাহারা জানে-অল্পকালের লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি নষ্ট করা আত্মঘাতী। আর আমরা আজও সেই হাঁসটির পেট কাটিতে দ্বিধা করি না, যাহা সোনার ডিম পাড়ে।
বলা হইয়া থাকে, 'চালাক মানুষ নিজের পথ বানায়, প্রাজ্ঞ মানুষ পথ তৈরি করে সমাজের জন্য।' উন্নত সমাজ এই দ্বিতীয় পথে চলিয়াছে, তৃতীয় বিশ্ব এখনো প্রথম পথেই ঘুরিয়া মরিতেছে। চালাকি হয়তো সাময়িক লাভ দেয়, কিন্তু দায়িত্ববোধ ও দায়বদ্ধতাই দেয় স্থায়িত্ব এবং মর্যাদা।
