ভিটেহীন দেলাবরের জীবনযুদ্ধ

আপডেট : ১৯ অক্টোবর ২০২৫, ১৭:০৪

একদিকে নদী, অন্যদিকে নিঃস্বতা। মাঝখানে এক জীবন সংগ্রাম করে যাচ্ছে দেলাবর মিয়া (৪৭)। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রমনা রেলওয়ে স্টেশন এলাকায় রেলের পরিত্যক্ত জায়গায় টিন আর বাঁশের ছাপড়া ঘরে দিন কাটছে তার। মাথার উপর অস্থায়ী ছাদ, পায়ের নিচে নেই এক চিলতে নিজের মাটি। তার জীবন এক অনবরত উৎখাত হওয়ার আতঙ্ক, আর বেঁচে থাকার অসীম লড়াইয়ের নাম।

দেলাবরের জীবনে ঝড় নেমেছিল প্রায় ৩০ বছর আগে। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে, মা মোছাঃ জামিলা বেওয়ার সঙ্গে ঠাঁই নিয়েছিলেন নানা বাড়ি, চিলমারীর সাতঘরি পাড়া এলাকায়। সেখানেই বেড়ে ওঠা, বিয়ে, সংসার। কিন্তু ঘর বাঁধা যায়নি স্থায়ীভাবে। কখনো আত্মীয়ের জায়গা, কখনো তহশিলদারের দয়া—শেষ পর্যন্ত রেলের ফাঁকা জমিতেই বাধতে হয় মাথার উপর সামান্য ছাদ।

দিনমজুরি করতেন দেলাবর, কিন্তু কয়েক বছর ধরে শারীরিক অসুস্থতায় তেমন কাজ আর করতে পারেন না। এখন যা পান, তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম। বেশিরভাগ দিনই ঘরে রান্না হয় না, উপোস থাকতে হয় স্ত্রী-সন্তানসহ পুরো পরিবারকে। বাধ্য হয়ে তার স্ত্রী আর্জিনা বেগম এখন শ্রমিকের কাজ করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন।

তাদের তিন মেয়ে সন্তানের মধ্যে বড়টি মাদ্রাসায় পড়ে। আর্জিনা বলেন, বড় মেয়েটার বয়স ১৪। ঠিকমতো খেতেও দিতে পারি না, বই-খাতা কোথা থেকে দেবো? মাঝে মাঝে শুনি রেলওয়ে ঘর ভেঙে দিবে। তখন ভাবি, মেয়েদের নিয়ে কোথায় যাবো?

রেললাইনের পাশে গিয়ে দেখা যায়—টিন দিয়ে ঘেরা একটিমাত্র ঘর, তার মধ্যেই গাদাগাদি করে থাকা বিছানা, কিছু প্রয়োজনীয় জিনিস। পলিথিন ও পাটকাটির তৈরি আরেকটি ঘরে চলে রান্নার কাজ। দেলাবর বলেন, শরীর খারাপ, আগের মতো কাজ করতে পারি না। সন্তানদের মানুষ করবো কীভাবে ভাবতেই চোখে পানি আসে।

স্থানীয় ইউপি সদস্য রুকুনুজ্জামান স্বপন বলেন, দেলাবর তার ওয়ার্ডে বাস করছেন ঠিকই কিন্তু ভোটার কার্ডের ঠিকানা অনুযায়ী তিনি অন্য ওয়ার্ডের বাসিন্দা। এজন্য তিনি সরকারী সুযোগ-সুবিধা পাননি। তবে তিনি উদ্যোগ নিয়েছেন সরকারী সুবিধার আওতায় তার পরিবারকে নিয়ে আসার জন্য।

স্থানীয় মানবাধিকারকর্মী মিজানুর রহমান মিজান বলেন, দেলাবরের মতো অসহায় মানুষদের রেলের ফাঁকা জমিতে মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে। শুধু মাথার উপর ছাদের আশায় তারা এখানে আছে। সরকারের উচিত দ্রুত তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা।

চিলমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার, সবুজ কুমার বসাক বলেন, অসহায় এ পরিবারটির বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে স্থায়ীভাবে বাসস্থানের ব্যবস্থা এবং কাজের সুযোগ করে দিতে আমরা চেষ্টা করব।

ইত্তেফাক/এএইচপি