উন্নয়নশীল বিশ্বে সরকার আসে, সরকার যায়; কিন্তু দেখা যায়, বর্তমান সরকারগুলি পূর্ববর্তী সরকারগুলির নানা অন্যায়-অনিয়ম ও দুর্নীতির কাহিনি বয়ান করিতে করিতেই নিজেদের মেয়াদের শেষ প্রান্তে আসিয়া দাঁড়ায়। সাধারণ মানুষ এই সময় ভাবেন, আহা, পূর্বের সরকারগুলি যদি দুর্নীতি না করিত, তাহা হইলে তাহারা দিব্যি রাজার হালে থাকিতে পারিত! এই সময় তাহাদের পূর্বের সরকারের দুর্নীতি এবং নানা অন্যায়-অবিচার ও নির্যাতনের এত কাহিনি শুনিতে হয় যে, তাহারা আন্দোলন-সংগ্রাম করিয়া কেন পরিবর্তন আনয়ন করিলেন, তাহা গৌণ হইয়া পড়ে। ইহাতে সাধারণ মানুষ না পান অর্থনৈতিক মুক্তি, না পান মৌলিক অধিকার বা ভয়ভীতিহীনভাবে জীবনযাপনের অবারিত সুযোগ। তখন তাহারা একসময় উপলব্ধি করিতে পারেন যে, তাহারা আসলে প্রতারণার শিকার হইয়াছেন। জনগণ দেশপ্রেমিক ও সঠিক নেতৃত্ব না পাওয়া পর্যন্ত কোনো পরিবর্তন হইতে কাঙ্ক্ষিত ও অর্থবহ পরিবর্তন আসাটা সম্ভব নহে।
পরিবর্তনের সেই অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছাইতে হইলে সম্মুখের দিকে দৃষ্টি দেওয়া প্রয়োজন। প্রয়োজন অতীত হইতে শিক্ষা গ্রহণ করা; কিন্তু অতীতের কাসুন্দি লইয়া পড়িয়া থাকিলে উন্নতি লাভ করা কীভাবে সম্ভব? উন্নয়নশীল দেশসমূহে দেখা যায়, এই সকল দেশের মানুষ বিভিন্ন সময় তাহাদের সমাজ ও রাষ্ট্রে পরিবর্তন আনয়নের মোক্ষম সুযোগ লাভ করেন; কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত অতীত চর্চা, হানাহানি, অনৈক্য ও অদূরদর্শিতার কারণে শেষ পর্যন্ত তাহার সদ্ব্যবহার করিতে পারেন না। তাহারা পূর্বের সরকার বা সরকারগুলির সমালোচনায় মত্ত হইয়া পড়িলেও নিজেদের দায়দায়িত্বের কথা অনেক সময় বেমালুম ভুলিয়া যান। তাহারা যাহা বলেন, তাহার সকলই যে ভিত্তিহীন তাহাও বলিবার অবকাশ নাই। তবে ইহাও সত্য যে, প্রতিটি সরকারেরই কোনো না কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ বা কর্মকাণ্ড রহিয়াছে; কিন্তু অতীত সরকারসমূহ লইয়া ঢালাও সমালোচনা চলিতে থাকায় বর্তমান চলিবার পথ কোনো না কোনোভাবে ব্যাহত হয়। ইহার পাশাপাশি ভবিষ্যতের চলিবার পথ হইয়া পড়ে শ্লথ ও অনিশ্চিত। এই জন্য উন্নয়নের ধারাবাহিকতা যেমন অব্যাহত রাখিতে হইবে, তেমনি জাতীয় ঐক্য বজায় রাখিয়া সম্মুখে চলিবার পথও সুপ্রশস্ত করিতে হইবে। অতীত সরকারের কেবল যৌক্তিক সমালোচনাকে প্রাধান্য দিতে হইবে। কেননা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌছাইতে ব্যর্থ হইলে ক্ষমতা হইতে চলিয়া যাওয়ার পর একইভাবে অন্য সরকার আসিয়া তাহাদের যে তুলাধুনা করিবে না তাহার কোনো নিশ্চয়তা নাই। এই জন্য বুদ্ধিমানের পরিচয় হইল, নিজের কাজে যত দ্রুত সম্ভব মনোযোগ বৃদ্ধি করা। আর ইহাই মঙ্গলজনক।
উল্লেখ্য, কাসুন্দি বাংলার একটি জনপ্রিয় খাবার। ঝাঁঝালোর কারণে জাপানের ওয়াসাবির মতো চক্ষে জল আনিতে সক্ষম। ইহার ঝাঁজ সর্দি-কাশিতে উপশম দেয়; কিন্তু পুরাতন বা বাসি কাসুন্দি অনেকটাই বিস্বাদ, খাওয়ার অযোগ্য এমনকি দুর্গন্ধময়। এই জন্য ‘পুরোনো কাসুন্দি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি’ বাগ্ধারার উৎপত্তি হইয়াছে বাংলা ভাষায়। অতএব, অতীতের চাইতে বর্তমান ও ভবিষ্যতের দিকেই আমাদের অধিক দৃষ্টি নিবদ্ধ করিতে হইবে। নতুবা এমন অভিযোগও উঠিতে পারে যে, সরকারের সাফল্যের কিছু নাই, তাই অতীতের কাসুন্দি ঘাঁটিয়া সাফাই গাওয়া হইতেছে। তাহা ছাড়া যে কোনো পরিবর্তনকে অর্থবহ করিতে হইলে বিগত সরকার যাহা করিয়া সমালোচিত হইয়াছে তাহা হইতে বিরত থাকিতে হইবে। তাহাদের প্রমাণ করিতে হইবে যে, তাহারা বিগত সরকারের চাইতে ব্যতিক্রম ও আলাদা। নতুবা আজ হউক, কাল হউক দেশে নূতন করিয়া একই সমস্যা বা অস্থিরতা দেখা দিবে এবং নূতন কোনো পরিবর্তনের পথকে ত্বরান্বিত করিবে। প্রতিটি পরিবর্তনের সময় সাধারণ মানুষ চাহে—তাহারা যেন তাহাদের সকল গণতান্ত্রিক ও নাগরিক অধিকার লইয়া আত্মসম্মানের সহিত নির্ভয়ে ও নিরাপদে এবং শান্তি-স্বস্তিতে বসবাস করিতে পারেন। পরিবর্তনকে অর্থবহ করিতে হইলে আমাদের এই নীতি ও রূপরেখা অনুসরণ করিতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে, শুধু ক্ষমতার পালাবদলের নাম পরিবর্তন নহে, দেশে শান্তি-শৃঙ্খলা, সুশাসন এবং রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক সকল দিক দিয়া স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠাতা করার নামই প্রকৃত পরিবর্তন।
