২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশের প্রেক্ষাপট বদলে যেতে শুরু করে। সাধারণভাবে ছাত্র-জনতা আন্দোলনের ভিত্তি ছিল চাকরির কোটা, শিক্ষা-সুবিধা, সামাজিক অন্যায় ও অবিচার এবং রাজনৈতিক বঞ্চনা। কিন্তু আগুনে ঘি লেগে ওঠার মতো ঘটনা ঘটে যখন আন্দোলনের ঢেউ শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ না থেকে তা দ্রুত দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে।
এই সময়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি উপাদান ছিল— ছাত্র-জনতার শক্তি এবং সশস্ত্র বাহিনীর (অবসরপ্রাপ্ত নয়, সক্রিয়/অবসরপ্রাপ্ত বাহিনীর) সহযোগিতা বা অন্তত নিরপেক্ষ অবস্থা। এই কলামে আমি প্রথমে আন্দোলনের পটভূমি তুলে ধরছি, এরপর সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা বিশ্লেষণ করব।
আন্দোলনের পটভূমি
যে আন্দোলন শুরু হয় শিক্ষা বিভাগীয় চাকরির কোটা নিয়ে, তা দ্রুত একটি বৃহত্তর গণআন্দোলনে পরিণত হয়। ছাত্ররা শুধু নিজের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রের “বিচারহীনতা” ও “অন্যায়”-এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চাকরিতে প্রবেশের সুযোগ— এসব নিয়েই উঠতে থাকে নানা মুখী প্রশ্ন।
এই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা ধীরে ধীরে সক্রিয় হয় এবং শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘাঁটায় সীমাবদ্ধ না থেকে কলেজ, মাদ্রাসা এমনকি সাধারণ মানুষের মাঝেও সে আন্দোলন বিস্তার লাভ করে। এ অবস্থায় আন্দোলনের শক্তি বাড়াতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল ক্ষমতা প্রয়োগকারীদের কঠোর অবস্থান, আইনপ্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষপাত এবং নিরাপত্তাবাহিনী বা সশস্ত্র বাহিনীর অবস্থান।
কারণ, সামাজিক উত্তাল সময়গুলোতে সাধারণভাবে বাহিনী বিরোধী না হয়ে থাকলেও “সাধারণ মানুষ বনাম বাহিনী”— এমন একটি ধারণা সৃষ্টি হয়ে যায়। জুলাই আন্দোলনে এখানেই আসে সশস্ত্র বাহিনীর অবস্থান ও সিদ্ধান্তের গুরুত্ব। কারণ, রাষ্ট্রীয় মেশিনের মধ্যে সশস্ত্র বাহিনী একটি স্থায়ী শক্তি; যদি তারা নিরপেক্ষ থাকে বা আধুনিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয়— তাহলে আন্দোলনের গতিবেগ ও পরিণতি বদলে যেতে পারে।
সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা এবং তার গুরুত্ব
অবসরপ্রাপ্ত ও সক্রিয় সৈন্য এবং অফিসারদের বক্তব্য, সম্পৃক্ততা এবং মনোভাব এই আন্দোলনের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হয়ে ওঠে। যেমন, এক আলোচনায় বলা হয়েছে— “অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারা সরাসরি মাঠে গিয়েছে, সক্রিয় সদস্যরা চূড়ান্ত মুহূর্তে আন্দোলনের দিক রূপ দিয়েছিল।”
বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা মূলত তিন দফায় বিভক্ত ছিল—
১. সক্রিয়/অবসরপ্রাপ্ত সদস্যদের মনোভাব ও ভূমিকা: অবসরপ্রাপ্ত সদস্যরা একটি শক্তিশালী বার্তা দিয়েছেন যে, “মানুষের বিরুদ্ধে আমাদের অস্ত্র চালু থাকবে না।” উদাহরণস্বরূপ, একটি প্রেস কনফারেন্সে বলা হয়, “প্রতিবাদকারীদের সঙ্গে সেনাবাহিনীর সম্পর্ক সন্তানের মতো।”
২. সক্রিয় সদস্যদের সিদ্ধান্ত: সক্রিয় বাহিনীর সদস্যরা হয়তো সরাসরি আন্দোলনের অংশ না হলেও, “অসংশ্লিষ্ট” বা “দমনকারী” বাহিনী হিসেবে এগোয়নি। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেনাবাহিনী জানিয়েছে— “আমরা যাতে সাধারণ ছাত্র-জনতার সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ অবস্থায় না যাই।”
৩. শুভ চিহ্ন হিসেবে সামাজিক অবস্থান: আন্দোলন চলাকালীন সেনাবাহিনীর এমন অপারেশন বা ভূমিকা দেখা গেছে যাতে তারা সাধারণ মানুষের হেফাজতে থাকা আহতদের চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছে এবং বিশৃঙ্খলা ও সহিংসতার তাৎক্ষণিক ধ্বংস ও নিয়ন্ত্রণে সহযোগিতা করেছে।
কেন এই ভূমিকা আন্দোলনের জন্য নির্ধারণী হয়ে উঠল?
একজন সাধারণ ছাত্র বা নাগরিক যখন সিদ্ধান্ত নেয় আন্দোলনের জন্য রাস্তায় নামবে, সে অনেক রকম আশঙ্কার মুখোমুখি হয়— আইনপ্রয়োগকারী বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনী ইত্যাদি। যদি বাহিনী ‘নিজেদের’ শক্তি ব্যবহার করে আন্দোলন দমন করতে থাকে, তাহলে সাহস কমে যায়।
কিন্তু এই ক্ষেত্রে বাহিনী দমনের দিকে না গিয়ে নিরপেক্ষ থেকেছে। তাতে আন্দোলন আরও গতি নিয়ে এগিয়েছে। বাহিনীর এই নিরপেক্ষ বা সমর্থনমূলক মনোভাব আন্দোলনকে একটি সামাজিক শক্তিতে পরিণত করে— “শিক্ষার্থীদের পক্ষেই রয়েছে রাষ্ট্রের স্থায়ী শক্তি”— এমন ধারণা তৈরি হয়।
সশস্ত্র বাহিনী যদি সরাসরি আন্দোলনে পাশ দিত বা সমর্থন করত, তাহলে তা রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট আরও গভীর করত। কিন্তু সেনাবাহিনীর ভূমিকা আন্দোলনের উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণে রেখে এমনভাবে পরিণতি দিয়েছে যে, শুধু কর্মসূচি নয় বরং পরিবর্তনের আসল কাজটি ঘটেছে।
পরিবর্তনের ধরণ ও পরিণতি
এই আন্দোলন শুধুই শিক্ষা জীবন বা কোটাপদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। এক পর্যায়ে তা “সরকার পরিবর্তন”-এর দাবিতে রূপ নেয়। সশস্ত্র বাহিনীর নিরপেক্ষ বা অনুকূল ভূমিকা এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে রাষ্ট্র এবং জনগণ উভয়ের মধ্যে অবিচ্ছিন্ন সংকেত যায়— যে শক্তি প্রয়োগ করে সহিংসভাবে দমন করার যে মডেল ছিল, তা আজ অতীত হয়ে যাচ্ছে।
দেখা গেছে, আন্দোলনের ফলাফল দ্রুত এসেছে। শিক্ষার্থীরা আত্মবিশ্বাসী হয়েছিল যে তারা একা নয়; রাষ্ট্রের স্থায়ী বাহিনী নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোও আন্দোলন দমন করার বদলে ধাপে ধাপে পরিবর্তনের পথে এগিয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, সশস্ত্র বাহিনী শুধু শক্তি প্রদর্শনের জন্য নয়, সমাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে “নিরাপত্তা অংশীদার” হিসেবে কাজ করেছে। ডেইলি অবজারভার-এর এক সংবাদে বলা হয়, “সেনাবাহিনী ২৫০০-এর বেশি আহত ছাত্র-ছাত্রীকে চিকিৎসা দিয়েছে।” সেনাবাহিনীর এই পদক্ষেপগুলো আন্দোলনের পক্ষে উৎসাহ জুগিয়েছে এবং মানুষকে দেখিয়েছে— “আপনারা একা নন, রাষ্ট্রও পাশে আছে।”
শিক্ষণীয় বিষয় ও চ্যালেঞ্জ
জুলাই আন্দোলনের এই অভিজ্ঞতা থেকে আমরা কিছু শিক্ষা নিতে পারি—
-
নিরপেক্ষ থাকার শক্তির গুরুত্ব: বাহিনী যদি জনগণ ও রাষ্ট্রের মধ্যে ভারসাম্য রাখতে পারে, তবে উত্তাল পরিস্থিতিও ধ্বংসের বদলে উন্নতির দিকে যেতে পারে।
-
আন্দোলন শুধু রাস্তায় নয়: আন্দোলনের সফলতা শুধু র্যালি বা বিক্ষোভের কারণে নয়; এটি সম্ভব হয়েছে শক্তি প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আচরণ ও সিদ্ধান্তের কারণে।
-
পরবর্তী দায়িত্ব: আন্দোলনের অর্জনগুলো যাতে স্থায়ী হয়, তা নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। সশস্ত্র বাহিনী যদি সামাজিক দায়িত্বও গ্রহণ করে, তা একটি ইতিবাচক মডেল তৈরি করবে।
-
ঝুঁকি ও সতর্কতা: যদি বাহিনী রাজনৈতিক প্রয়োজনে হঠাৎ আগ্রাসী হয়ে ওঠে, তা বিপরীত ফল দিতে পারে। তাই ভবিষ্যতে বাহিনীর রাজনৈতিক সম্পর্ক ও জনবিশ্বাস নজরে রাখা জরুরি।
২০২৪-এর ছাত্র-জনতার আন্দোলন দেখিয়েছে যে, শুধু জনগণ নয়, রাষ্ট্রীয় শক্তিও পরিবর্তনের অংশ হতে পারে। শিক্ষার্থীরা যখন রাস্তায় নামল, তারা একা ছিল না। সবচেয়ে বড় শক্তি হলো— যারা ক্ষমতাশালী, যদি তারা জনগণের পাশে দাঁড়ায়, তবে ইতিহাস বদলে যেতে পারে।
সশস্ত্র বাহিনীর নিরপেক্ষ ও সহযোগিতামূলক ভূমিকা আন্দোলনের সফলতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। এটি ভবিষ্যতের জন্য একটি মডেল হতে পারে— যেখানে শক্তি প্রয়োগ হয় দমন নয়, বরং নিরাপত্তা ও বিশ্বাস স্থাপন করতে।
(লেখক সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক)
