রাত কাটে নদী ভাঙনের শব্দে, ঘরহারা মন্নিয়া চরের মানুষ

আপডেট : ২৯ অক্টোবর ২০২৫, ১৬:১২

জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার যমুনা নদীতে দেখা দিয়েছে ভয়াবহ ভাঙন। এতে ইতিমধ্যে শতাধিক বসতভিটা ও কয়েক বিঘা ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে আরও অনেক বাড়িঘর, কৃষিজমি, স্কুল-মাদ্রাসাসহ একাধিক স্থাপনা। ভাঙন রোধে বিভিন্ন দপ্তরে দৌড়ঝাঁপ করেও কোনো সমাধান না পেয়ে এখন নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় প্রতিরোধের চেষ্টা করছে স্থানীয়রা।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, মন্নিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি চরে নদীভাঙন রোধে পদক্ষেপ নিতে সমীক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে।

গত তিন মাস ধরে জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলার দুর্গম মন্নিয়া চরে নদীভাঙন চলছে। যমুনা নদীর বাম তীরের প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ভাঙনে বিলীন হয়েছে চার শতাধিক বসতবাড়ি ও কয়েক বিঘা ফসলি জমি। ভাঙনের হুমকিতে রয়েছে আরও শতাধিক বাড়িঘর, কৃষিজমি, স্কুল-মাদ্রাসা ও একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক। অসময়ে যমুনার এমন ভয়ংকর রূপে নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন নদীপাড়ের মানুষ।

মঙ্গলবার দুপুরে মন্নিয়া চরে সরেজমিনে কথা হয় স্থানীয়দের সঙ্গে। আব্দুল আজিজ নামে এক বাসিন্দা জানান, নদীভাঙনের ক্ষতির কথা বললে দুই-চার মাসেও শেষ হবে না। চার শতাধিক বাড়িঘর, মসজিদ-মাদ্রাসা সব নদীতে ভেঙে যাচ্ছে। এখন বাজার, স্কুল—সবই সিরিয়ালে আছে।

হেলাল উদ্দিন নামে আরেক বাসিন্দা জানান, সাত দিন আগে আমার বাড়ি নদী ভেঙে নিয়ে গেছে। এখন রাস্তায় ঘর তুলেছি। ছেলে-মেয়েরা পড়তে পারে না, মাদ্রাসা-স্কুলে যেতে পারে না। তিন মাস আগে থেকে ভাঙন শুরু হয়েছে—মাঝে একটু কমেছিল, এখন আবার বেড়েছে।

আবু সাইদ নামে একজন জানান, যদি এভাবে নদী ভাঙতে থাকে, তাহলে আমাদের ঘনবসতি, ৫–৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠান, ৭টি মহিলা মাদ্রাসা এবং ১২–১৩টি মসজিদ সবই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

সরকারি কার্যালয় ও জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও কোনো পদক্ষেপ না পাওয়ার অভিযোগ স্থানীয়দের। তাই তারা একটি যুব সংগঠনের মাধ্যমে নিজস্ব ব্যবস্থায় ভাঙন প্রতিরোধের উদ্যোগ নিয়েছেন।

আবু বক্কর সিদ্দিক নামে এক স্থানীয় বলেন, আমরা পানি উন্নয়ন বোর্ডে গিয়েছি, উপজেলা অফিসে গিয়েছি, চেয়ারম্যানের কাছেও গিয়েছি। ২০ অক্টোবর মানববন্ধনও করেছি। কিন্তু কেউ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

স্থানীয় রুবেল রানা জানান, আমাদের গ্রামে প্রায় দুই হাজার পরিবার রয়েছে। পরিবারপ্রতি এক হাজার টাকা করে চাঁদা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রবাসী ভাইয়েরাও সহায়তা করছেন। এখন পর্যন্ত প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা উঠেছে।

স্থানীয় যুবক জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা আপাতত পাঁচ হাজার বস্তার অর্ডার দিয়েছি। সেই বস্তা বালু দিয়ে ভরে নদীতে ফেলে ভাঙন প্রতিরোধের চেষ্টা করব। তবে এতে আরও অর্থের প্রয়োজন।

জামালপুর নদী রক্ষা কমিশনের সদস্য জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘এমন উদ্যোগ জামালপুরে আগে দেখা যায়নি। মন্নিয়া চরের বাসিন্দাদের উদ্যোগ দেখে আমরা সকলে শিক্ষা নিতে পারি। সহযোগিতা না পেলে কিভাবে উদ্যোগী হয়ে প্রতিরোধ করতে হয়। আর এখানে সরকার যদি কিছুটা সহায়তা করে তাহলে তাদের উদ্যোগ আরও কার্যকরী হবে।’ 

এসব বিষয়ে জামালপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নকিবুজ্জামান বলেন, ‘মন্নিয়াসহ আশপাশের কয়েকটি চরে যমুনা নদীর ভাঙন রোধে পদক্ষেপ নিতে সমীক্ষা কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে। সেই সমীক্ষার প্রতিবেদন আমরা খুব দ্রুত প্রেরণ করবো। এরপর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে টেকসই কার্যক্রম বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। 

তিনি আরও বলেন, ‘মান্নিয়া চর বিশাল একটি জায়গা। এই বড় জায়গাতে ক্ষুদ্র কোনো পদক্ষেপ বা অল্প পরিমানে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করা কাজে আসবে না। এটি আরো অপচয় হবে। তাই সেখানে বৃহৎ প্রকল্প প্রয়োজন।’

ইত্তেফাক/এএইচপি