বাঘা-লালপুর-দৌলুতপুরের নতুন আতঙ্ক ‘কাকন বাহিনী’, অতিষ্ঠ তিন জেলার মানুষ

আপডেট : ৩১ অক্টোবর ২০২৫, ১৬:১৯

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার পদ্মা নদীর চরে জমি দখলকে কেন্দ্র করে সংঘটিত ডাবল মার্ডারের ঘটনায় আলোচনায় উঠে এসেছে কাকন বাহিনী। এ ঘটনায় নিহত আমান মণ্ডলের পিতা মিনহাজ মণ্ডল বুধবার বিকেলে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানায় কাকনকে প্রধান আসামি করে ২৩ জনের নামে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন।

এই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের বিচারের দাবিতে শুক্রবার (৩১ অক্টোবর) দুপুর ১২ টায় বাঘার খানপুর বাজারে মানববন্ধন করেন নিহত চারজনের পরিবার ও স্থানীয় এলাকাবাসী।

মানববন্ধনে মিনহাজ মণ্ডল বলেন, কাকন বাহিনী ও তাদের লোকজন প্রকাশ্য দিবালোকে নদীপথে পিচবোর্ডে চড়ে অস্ত্রের মহড়া দিচ্ছে। আমরা অবিলম্বে এসব হত্যাকারীদের গ্রেফতারসহ আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানাচ্ছি।”

মাহাবুল আলম বলেন, কাকন বাহিনীর ফসল লুটের প্রতিবাদ করতে গিয়ে গত বছর পিস্তলের গুলিতে গুরুতর আহত হয়েছিলেন খানপুর গ্রামের সাহাবুল ইসলাম। তাকে পরে ঢাকায় চিকিৎসা করাতে হয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুর — এই তিন উপজেলার পদ্মা চরে একমাত্র আতঙ্ক এখন কাকন বাহিনী। জমি ও বালুমহাল দখল, চাঁদাবাজি ও হামলার ঘটনায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন তিন জেলার মানুষ।

গত সোমবার খানপুর পদ্মা নদীর পাড়ে জমি ও খড় দখলকে কেন্দ্র করে কাকন বাহিনীর গুলিতে চারজন গুলিবিদ্ধ হন। এর মধ্যে আমান মণ্ডল ও নাজমুল হক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। আহতরা হলেন মুনতাজ ও রাকিব।

এদিকে বাঘা থানা পুলিশের এক মুখপাত্র জানান, বারবার অভিযান চালিয়েও কাকন বাহিনীর প্রধান কাকনের কোনো হদিস পাওয়া যায়নি। জানা গেছে, কাকনের আদি বাড়ি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের রায়চা গ্রামে। তার বাবা মৃত জমির উদ্দিন একজন স্বাস্থ্য সহকারী ছিলেন। কাকন ১৯৯৪ সালে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি সম্পন্ন করেন এবং একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ২০০৭ সালে তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমান। কয়েক বছর পর দেশে ফিরে এসে স্থানীয় রাজনীতিকদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে এলাকার বালুমহাল নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেন। বালুমহাল দখল নিয়েই তিনি গড়ে তোলেন সন্ত্রাসী কাকন বাহিনী, যার সদস্যসংখ্যা বর্তমানে প্রায় ৪০ জন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এ বছর বন্যার পর খানপুর পদ্মার চরের প্রায় পাঁচশ বিঘা জমির খড় দখল নিয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কাকন বাহিনীর সঙ্গে বাঘার মনতাজ মণ্ডল গ্রুপের দ্বন্দ্ব চলছিল। গত সোমবার সকালে মনতাজ মণ্ডল ও তার সহযোগীরা খড় কাটতে গেলে দুপুরে কাকন বাহিনীর ১০–১৫ জনের একটি সশস্ত্র দল নদীপথে পিচবোর্ডে চড়ে এসে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। গুলির শব্দে প্রথমে স্থানীয়রা কাছে যেতে সাহস পাননি। পরে গ্রামবাসী ঘটনাস্থলে পৌঁছালে কাকন বাহিনীর লোকজন পালিয়ে যায়। আহতদের উদ্ধার করে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে আমান মণ্ডল অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মারা যান। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান নাজমুল হক।

মানববন্ধনে নিহত আমান মণ্ডলের স্ত্রী আসমা বেগম ও নাজমুলের স্ত্রী শারমিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার কথিত কাকন বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সোলায়মান শেখ জানান, কাঁকন বাহিনীর সদস্যরা মাঝে মধ্যেই এলাকায় গোলাগুলি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেন। গত ৫ জুন ঈশ্বরদী উপজেলার সাড়াঘাটে বালুমহলের নিয়ন্ত্রণ নিতে ফিল্মি স্টাইলে অস্ত্রের মহড়া ও গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটান কাঁকন সহ তার সদস্যরা। সর্বশেষ তারা জমি ও খড় দখলকে কেন্দ্র করে বাঘা উপজেলার খানপুর গ্রামের চারজনকে গুলি করেন। এর মধ্যে দু’জন মারা যান। এ বিষয়ে থানায় মামলা রজু করা হয়েছে। আমরা তাদের গ্রেফতার করার চেষ্টা চালাচ্ছি।

ইত্তেফাক/এএইচপি