ধান-মাছের রাজ্যে নেই উন্নয়নের সড়ক

আপডেট : ০৫ নভেম্বর ২০২৫, ১২:০০

দেশের সমতল ভূখণ্ডের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ না থাকায় নিম্নাঞ্চলীয় হাওরদ্বীপ খালিয়াজুরী আজও বিচ্ছিন্ন এক জনপদ। উপজেলা সদর থেকে বোয়ালীবাজার পর্যন্ত মাত্র ১০ কিলোমিটারের পথ পাড়ি দিতে শুকনো মৌসুমেও সময় লাগে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। যাত্রীদের কয়েক দফায় বাহন পরিবর্তন করতে হয়, আর জনপ্রতি ভাড়া দিতে হয় অন্তত দুই শত টাকা।

বর্ষাকালে সাত মাস ধরে এই পথ থাকে পানির নিচে। সড়ক ও জনপথ বিভাগের সাবমার্জেবল এই সড়কে তখন ভরসা থাকে ইঞ্জিনচালিত নৌকার ওপর, তাও চলে দিনের নির্দিষ্ট সময়ে। সন্ধ্যা নামলেই বন্ধ হয়ে যায় নৌযান চলাচল। রোগী বা জরুরি প্রয়োজনে তখন মানুষ পড়েন ভয়াবহ বিপাকে।

স্থানীয়দের ভাষায়, ‘খালিয়াজুরী এখন যেন এক পানিশমেন্ট জোন।’ যোগাযোগব্যবস্থার এই বেহাল অবস্থার কারণে আধুনিক নাগরিক সুবিধা এখানকার মানুষের কাছে আজও অধরাই। সরকারি চাকরিজীবীরাও এখানে পোস্টিং নিতে অনাগ্রহী; ফলে অধিকাংশ দপ্তরেই বছরের পর বছর শূন্যপদ পড়ে থাকে।

এই বাস্তবতা স্বীকার করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বলেন, ‘দুর্গম যোগাযোগের কারণে এখানে চাকরি এবং জীবন ধারন করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।’

খালিয়াজুরীর অর্থনীতি নির্ভর করে ধান ও মাছের উপর। কিন্তু দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এই দুই খাতেই প্রতিবছর ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, প্রতি বছর এখানকার হাওর থেকে প্রায় ২০ হাজার মেট্রিক টন দেশীয় মাছ উৎপন্ন হয়। “সময়মতো রাজধানী বা বড় বাজারে পৌঁছাতে না পারায় প্রচুর মাছ নষ্ট হয়ে যায়,” বলেন তিনি।

উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুর রউফ স্বাধীন ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান কেষ্টু বলেন, ধান উৎপাদনের জন্য খালিয়াজুরীর খ্যাতি আছে। কিন্তু যোগাযোগ দুর্বল হওয়ায় কৃষকেরা ধান বিক্রি করে ন্যায্য দাম পান না। ভাড়া ও সময়ের খরচে লাভের বড় অংশ হারিয়ে যায়।

খালিয়াজুরী বাজারের ব্যবসায়ী সোহান-বিন-নবাব বলেন, সরকার প্রতি বছর এখানকার জলমহাল ইজারা দিয়ে কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আয় করে। অথচ উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি— উড়ালসড়ক নির্মাণে কোনো উদ্যোগ দেখা যায় না।

স্থানীয়দের বহু বছরের দাবি— উপজেলা সদর থেকে বোয়ালীবাজার পর্যন্ত ১০ কিলোমিটার উড়ালসড়ক নির্মাণের।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. অঞ্জন দেব রায় জানান, খালিয়াজুরীতে উড়াল সড়ক স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে প্রায় আড়াই বছর আগে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর থেকে একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে স্থানীয় সরকার বিভাগে। এ প্রস্তাবটি পাঠানোর আগে তার নেতৃত্বে কয়েকজন প্রকৌশলী এসে সড়ক স্থানটি ঘুরেও দেখেছেন বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল্লাহ আল মাহমুদ জামান বলেন, ‘খালিয়াজুরীতে এমন কোনো প্রকল্প আছে কি না, তা আমার জানা নেই। তবে বিষয়টি খুঁজ নিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করব।’

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, হাওরবেষ্টিত খালিয়াজুরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেশের অন্যতম মনোমুগ্ধকর। যদি উড়ালসড়ক নির্মিত হয়, তাহলে এটি হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম হাওর-ভিত্তিক পর্যটন গন্তব্য।

খালিয়াজুরীর মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশা উন্নয়নের পথ। তাদের বিশ্বাস, উড়ালসড়ক নির্মাণ হলে খালিয়াজুরী আর ‘পানিশমেন্ট জোন’ থাকবে না; উন্নয়ন পৌঁছে যাবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষিতে। গর্ভবতী নারী বা জরুরি রোগী পরিবহনে কমবে প্রাণহানি। ধান-মাছের রাজ্য খালিয়াজুরী তখন হয়ে উঠবে “উন্নয়নের সোনালী দ্বীপ।

ইত্তেফাক/এএইচপি