কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেনের ইচ্ছে ছিল একমাত্র ছেলে ওমর ফারুককে (১০) বানাবেন কোরআনে হাফেজ। কিন্তু ভয়াবহ ভূমিকম্পে সেই স্বপ্নের যেন চাপা পড়ে গেছে; দেয়াল চাপায় একসঙ্গে মৃত্যু হয় বাবা-ছেলের। একইসঙ্গে আহত হন; দেলোয়ারের দুই মেয়ে উষা (১৭) ও তাহুফা (১৪)। এরপর তাদের ঠাঁই হয় হাসপাতালে।
সর্বশেষ শনিবার (২২ নভেম্বর) সকালে বাবা এর ছোট ভাইকে ওমর ফারুকে শেষ বিদায় জানাতে আসে দুই বোন। এসময় উষার হাতে ছিল ক্যানুলা। বাবা-ভাইয়ের দাফন শেষে তাকে আবার নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। এসময় স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে আশপাশের এলাকা। বাবা-ভাইকে হারিয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন উষা ও তাহুফা।
স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে লুৎফুর নেছা (লুৎফা) হয়ে গেছেন নির্বাক।
এর আগে শুক্রবার সকালে নরসিংদীর গাবতলী এলাকায় ভূমিকম্পে দেয়াল ধসে নিহত হন দেলোয়ার হোসেন উজ্জ্বল ও তার ছেলে ওমর ফারুকের। তাদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়ায়। শনিবার সকালে ঘটনাস্থল থেকে তাদের মরদেহ পাকুন্দিয়ায় আনা হলে এমন দৃশ্য দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এদিন সকাল সাড়ে ১০টায় পাকুন্দিয়া পৌরসভার উত্তরপাড়া গ্রামের স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাদের দাফন করা হয়। জানাজা অংশ নেয় উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, নিহতের সহকর্মী, আত্মীয় স্বজনসহ দূর-দূরান্ত থেকে আগত অসংখ্য মানুষ।
নিহতদের পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনে উচ্চমান সহকারী পদে কর্মরত ছিলেন দেলোয়ার। চাকরির সুবাদে তিনি নরসিংদী শহরের গাবতলী এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় থাকতেন। শুক্রবার সকালে ভূমিকম্পের সেই বাসা থেকে একমাত্র ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে বেরিয়ে গলির মুখে দাঁড়ান। এসময় পাশের নির্মাণাধীন একটি ভবন থেকে তাদের ওপর দেয়াল ধসে পড়ে। গুরুতর আহত অবস্থায় চারজনকে নেওয়া হয় নরসিংদী সদর হাসপাতালে। সেখানে থেকে দেলোয়ার ও ওমর ফারুককে ঢাকায় রেফার্ড করা হয়। ঢাকায় আনার পথে তাদের মৃত্যু হয়। নিহত ওমর নরসিংদীর একটি মাদ্রাসায় হেফজ বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন।
অন্যদিকে দেলোয়ারের দুই মেয়ে উষা ও তাহুফা হাসপাতালেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। তবে সকালে বাবা-ভাইয়ের জানাজা ও দাফনের আগে তাদের বাসায় আনা হয়। এরপর উষাকে আবারও নেওয়া হয় হাসপাতালে। কিছুটা সুস্থ হয়ে ওঠায় তাহুফাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। তবে চোখের সামনেই বাবা-ভাইকে হারিয়ে নির্বাক হয়ে গেছে দুই বোন।
নিহত দেলোয়ারের ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন সেতু জানায়, আমার ভাইয়ের স্বপ্ন ছিল ওমর ফারুককে হাফেজ বানাবেন। কিন্তু তা আর হলো না। তাদের দাফনের আগে উষা ও তাহুফাকে হাসপাতাল থেকে আনা হয়েছে। এরপর চিকিৎসকদের পরামর্শে তাহুফাকে আবারও হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। একসঙ্গে স্বামী ও একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ভাবীও বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।

