জৌলুস হারাচ্ছে পাথরঘাটার হরিণঘাটা পর্যটন কেন্দ্র

ভাঙ্গাচোরা অবকাঠামোয় মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন পর্যটকরা

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৫, ১১:৪৭

অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সুন্দরবনের অংশবিশেষ এবং বঙ্গোপসাগরের মোহনার মনোরম পরিবেশ সত্ত্বেও বরগুনার পাথরঘাটার জনপ্রিয় হরিণঘাটা পর্যটন কেন্দ্রটি এখন পর্যটকশূন্য। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি তদারকি ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অপার সম্ভাবনাময় এই স্পটটি তার জৌলুস হারাচ্ছে। বিশেষ করে জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক পর্যটকই আর এ স্থানে ভিড় জমাচ্ছেন না।

হরিণঘাটা বনাঞ্চল তার চিত্রল হরিণ, বানর, বিভিন্ন প্রজাতির পাখি, ঘন ম্যানগ্রোভ বন এবং নদীর মোহনার সৌন্দর্যের জন্য পরিচিত। কয়েক বছর আগেও এখানে প্রতিদিন শতাধিক পর্যটকের সমাগম হতো, কিন্তু এখন অব্যবস্থাপনার কারণে সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না। বিশেষ করে ঘন বনাঞ্চলে পর্যটকদের জন্য ন্যূনতম নিরাপত্তা নেই। নারী ও পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা পর্যটকদের মতে, নিরাপত্তার অভাবে তারা আসতে অনীহা প্রকাশ করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পাথরঘাটা থেকে হরিণঘাটা পর্যন্ত নড়বড়ে যোগাযোগব্যবস্থা।

বন বিভাগের পাথরঘাটা রেঞ্জ কার্যালয় সূত্র জানায়, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ২০১৩ সালের শেষ দিকে হরিণঘাটা-লালদিয়া সংরক্ষিত বনাঞ্চলে ইকোট্যুরিজম বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রায় তিন হাজার হেক্টর এলাকায় পাঁচতলা পর্যবেক্ষণ টাওয়ার, এক কিলোমিটার দীর্ঘ কাঠের ফুট ট্রেইল, চারটি পাকা বিশ্রামাগার, একটি সেতু, কয়েকটি বেঞ্চ এবং গণশৌচাগার নির্মাণ করা হয়। পরে ট্রেইলের নষ্ট পাটাতন সিমেন্ট দিয়ে সংস্কারও করা হয়।

তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, বর্তমানে ফুট ট্রেইলের অধিকাংশ অংশ ভাঙ্গাচোরা। পাটাতন ভেঙে পড়ায় পর্যটকরা বন পেরিয়ে লালদিয়ার সমুদ্রচরে যেতে পারছেন না। ওয়াচ টাওয়ারের বিভিন্ন স্থানে পলেস্তার খসে পড়ছে। নির্মিত বিশ্রামাগারগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পর্যাপ্ত ও পরিচ্ছন্ন ওয়াশরুমের অভাবে বিশেষ করে নারী পর্যটকরা চরম বিড়ম্বনায় পড়েন।

পর্যটক তাসীন হাসান বলেন, এতো সুন্দর একটি প্রাকৃতিক স্থান কেবল পরিকল্পনার অভাবে পর্যটক টানতে পারছে না। নিরাপত্তাহীনতা, ভাঙ্গাচোরা ট্রেইল ও ওয়াচ টাওয়ারের ঝুঁকিপূর্ণ সিঁড়ি—সব মিলিয়ে পরিবার নিয়ে আসার সাহস হয় না। দ্রুত সংস্কার না হলে পর্যটক হারাবে এই স্পট।

আরেক পর্যটক মোসা. আসমা আক্তার বলেন, একদিকে সাগর, অন্যদিকে নদীর মোহনা—প্রকৃতির এত সৌন্দর্য কোথাও নেই। কিন্তু ফুট ট্রেইলের অবস্থা এমন যে বাচ্চাদের নিয়ে হাঁটাই কঠিন। বিশ্রামাগারগুলো ভগ্নদশায়, ওয়াশরুম নেই। এভাবে পর্যটক কীভাবে স্বচ্ছন্দে ঘুরবে?”

পর্যটন বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি উদ্যোগ থাকলে হরিণঘাটা কুয়াকাটার মতো একটি বড় পর্যটন আকর্ষণে পরিণত হতে পারত। এতে উপকূলীয় পাথরঘাটার অর্থনীতিতেও বড় পরিবর্তন আসত। কিন্তু দীর্ঘদিনের অবহেলায় সম্ভাবনার জায়গাটি আজ বিপর্যস্ত।

পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মিজানুর রহমান বলেন, হরিণঘাটা পর্যটন কেন্দ্রের প্রবেশদ্বার থেকে সেতু পর্যন্ত সংস্কারের জন্য জেলা পরিষদ থেকে তিন লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। পাশাপাশি লালদিয়ায় উন্নয়ন কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বন বিভাগের জনবল সংকট থাকায় নিরাপত্তায় ঘাটতি রয়েছে। এখানে পুলিশের একটি টহল টিম থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। কোনো পর্যটককে কেউ উত্ত্যক্ত করলে অভিযোগ পাওয়া মাত্রই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এএইচপি