সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় সাত কলেজের দেড় লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। ভয়াবহ সেশনজটে পড়তে যাচ্ছে তারা। প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির খসড়া অধ্যাদেশের বিরুদ্ধে পাঁচ দিনের কর্মসূচি গতকাল থেকে শুরু করেছেন শিক্ষকরা। অন্যদিকে পালটা কর্মসূচি হিসেবে দ্রুত বিশ্ববিদ্যালয় অধ্যাদেশ জারি ও ক্লাস-পরীক্ষা চালু রাখার দাবিতে ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাসে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল কর্মসূচি পালন করেন। ইডেনকে শুধু নারীদের জন্য সংরক্ষিত করার দাবিতে দুই দিনের আলটিমেটাম দিয়েছেন কলেজটির শিক্ষার্থীরা। অন্যদিকে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি বাতিলের দাবিতে ঢাকা কলেজের উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থীরা গত তিন দিন ধরে আন্দোলন করছেন। ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির প্রথমবর্ষের সাড়ে ১১ হাজার শিক্ষার্থী এক বছরেও ক্লাস না পেয়ে আন্দোলনে নেমেছেন। দ্রুত ক্লাস শুরু না করলে সামনে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি তাদের। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, একাধিক গ্রুপের অনড় অবস্থানের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ ঘোষণা বিলম্ব হচ্ছে।
শিক্ষাবিদরা বলেন, ২০১৭ সালে অনেকের আপত্তি অগ্রাহ্য করে অধিভুক্তির সিদ্ধান্ত যেমন ছিল অপরিণামদর্শী, এবারও তাড়াহুড়া করে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা দিয়ে সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। শিক্ষকেরা বলেন, ‘একটি অধিভুক্তিমূলক বিশ্ববিদ্যালয় করলেই সহজ সমাধান পাওয়া যেত।’ এদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যখন ছয় মাসের ক্লাস শেষ করতে চলেছেন, এমনকি নতুন শিক্ষাবর্ষের ভর্তিও আসন্ন, তখন সাত কলেজ এখনো ভর্তিপ্রক্রিয়া শেষ করতেই পারেনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে দুই দফা ক্লাস শুরুর তারিখ নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও সাত কলেজের শিক্ষকরা তা মানতে নারাজ। প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির কাঠামো, কর্তৃত্ব, কর্মপদ্ধতি- এখনো স্পষ্ট নয়। ঢাকা কলেজের এক শিক্ষক স্পষ্টই জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ভর্তি আইনসিদ্ধ নয়। ফলে তাদের পক্ষে স্নাতক (সম্মান) প্রথম বর্ষের ক্লাস নেওয়া সম্ভব নয়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, প্রস্তুতিহীন অবস্থায় কেন ভর্তিপ্রক্রিয়া শুরু করা হলো? এর দায় কার? সংশ্লিষ্টরা বলেন, কলেজগুলো চলছে অন্তর্বর্তী প্রশাসকের মাধ্যমে একটি কাঠামোহীন, স্বল্প ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যবস্থায়। এ অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন শিক্ষার্থীরা। ভর্তি পরীক্ষা হয়েছে আগস্টে, কিন্তু নভেম্বরের শেষ ভাগে এসেও ভর্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হলো না—এর চেয়ে বিশৃঙ্খলা আর কী হতে পারে? সমস্যা আরো জটিল হয়েছে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় মডেলকে কেন্দ্র করে। হাইব্রিড কাঠামোর প্রস্তাবে ৪০ শতাংশ অনলাইন ও ৬০ শতাংশ সশরীর ক্লাস, এক বা একাধিক কলেজে বিভাগভিত্তিক পাঠদান, বিদ্যমান অনেক বিষয়ে কাটছাঁট—এসব নিয়ে শিক্ষক, উচ্চমাধ্যমিকের শিক্ষার্থী এবং স্নাতক-স্নাতকোত্তর পর্যায়ের মধ্যে মতপার্থক্য অনেক।
এদিকে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির খসড়া অধ্যাদেশে একের পর এক অস্পষ্টতা ও প্রশাসনিক জটিলতার অভিযোগ তুলে সরকারি সাত কলেজের শিক্ষকরা আবারও কর্মবিরতির ঘোষণায় ফিরেছেন। তাদের দাবি, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো চূড়ান্ত না হওয়ায় ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ভবিষ্যত্ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, আর শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়ই এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছেন। এ পরিস্থিতির দ্রুত সমাধান না হলে দেশ জুড়ে আরো কঠোর কর্মসূচিতে যাওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন তারা। সোমবার সাত কলেজ স্বাতন্ত্র্য রক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক এবং ইডেন মহিলা কলেজের অধ্যাপক মাহফিল আরা বেগমের সই করা এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়েছে। শিক্ষকদের প্রধান দাবি, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার স্বার্থে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সব স্তরে স্থায়ীভাবে কেবল বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে অধ্যাদেশ জারি করতে হবে। অন্যদিকে দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পরিষদের পক্ষ থেকে কয়েক দিনের কর্মসূচিও দেওয়া হয়েছে। কর্মসূচির অংশ হিসেবে গতকাল সকাল ১০টায় মাউশি প্রাঙ্গণে গণজমায়েত করা হয়। আজ ৩ ডিসেম্বর দেশব্যাপী সরকারি কলেজে মানববন্ধন ও প্রেস ব্রিফিং, ৪ ডিসেম্বর পাবলিক পরীক্ষা বন্ধসহ সাত কলেজে সর্বাত্মক কর্মবিরতি এবং সর্বশেষ ৬ ডিসেম্বর সারা দেশের বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অংশগ্রহণে কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে মহাসমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া চূড়ান্ত অধ্যাদেশে শিক্ষকদের মতামত উপেক্ষা করা হলে সারা দেশের সরকারি কলেজে অনির্দিষ্টকালের সর্বাত্মক কর্মবিরতি (টোটাল শাটডাউন) শুরু হবে বলেও হুঁশিয়ারি জানানো হয়েছে।
এদিকে রাজধানীর ইডেন কলেজকে শুধু নারীদের জন্য সংরক্ষিত করার দাবি জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষার্থীরা। পাশাপাশি দুই দিনের মধ্যে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানিয়ে আলটিমেটাম দিয়েছেন তারা। গতকাল মঙ্গলবার কলেজ ক্যাম্পাসে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানান তারা। ইডেন মহিলা কলেজের স্বাতন্ত্রতা রক্ষা করা এবং নারীদের জন্য নিরাপদ উচ্চশিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ইডেন মহিলা কলেজ বাংলাদেশে নারীদের শিক্ষা, স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও আত্মবিশ্বাসের অন্যতম প্রধান এবং ঐতিহ্যবাহী একটি প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিন ধরে ইডেন শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; বরং নারীদের জন্য অগ্রগতির এক বিশেষ প্রতীক। দেশের লাখো নারী জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে ইডেনকে তাদের শক্তির উত্স হিসেবে মনে করে এসেছে।
সব পদে শিক্ষা ক্যাডার রেখে অধ্যাদেশ দাবি শিক্ষকদের
রাজধানীর সরকারি সাতটি কলেজ নিয়ে প্রস্তাবিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির ‘স্কুলিং’ পদ্ধতি বাতিল এবং একাডেমিক ও প্রশাসনিক সব পদে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারকে স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করে আইন করার দাবি জানিয়েছেন কলেজগুলোর শিক্ষকরা। মঙ্গলবার মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর শিক্ষা ভবন চত্বরে সমাবেশ করে তারা এই দাবি তুলেছেন। ‘সাত কলেজ স্বাতন্ত্র্য রক্ষা পরিষদ’ নামে কলেজগুলোর শিক্ষকদের সংগঠনের ব্যানারে এ সমাবেশ হয়েছে।
ঢাকা কলেজের শিক্ষক জহিরুল ইসলাম বলেন, ‘খসড়া অধ্যাদেশে যে ‘স্কুলিং’ পদ্ধতির কথা বলা হচ্ছে, আমরা তা বাতিল চাই। কলেজগুলোর স্বতন্ত্র কাঠামো বজায় রেখে আমরা প্রস্তাবিত ইউনিভার্সিটির একাডেমিক ও প্রশাসনিক সর্বস্তরে বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের সদস্যদের অন্তর্ভুক্ত করে অধ্যাদেশ জারির দাবি জানাচ্ছি।’ সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের সহকারী অধ্যাপক তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা চাইছি কলেজগুলোর একাডেমিক বা শিক্ষক পদগুলোতে যেমন শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারা আছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পদগুলোতেও শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। আর প্রশাসনিক পদগুলোতে অর্থাত্ ভিসি, প্রো-ভিসি, ট্রেজারার বা কন্ট্রোলার পদগুলোতেও শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করার অনুরোধ আমরা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে জানাচ্ছি। আর বর্তমানে কলেজগুলোর শিক্ষক ও কর্মচারী পদগুলোতে যেভাবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে নিয়োগ হয়, সে ধারা যেন বজায় থাকে তা নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি আমরা।’

