ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

বিএনপির দুর্গ কক্সবাজারের দখল নিতে চায় জামায়াত

আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ২০:২৬

নয়টি উপজেলা ও চারটি পৌরসভা নিয়ে কক্সবাজারের চারটি সংসদীয় আসন। সর্বদক্ষিণের এই জেলা বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে বিগত সময়ে জোটবদ্ধ নির্বাচনে চারটি আসনের প্রত্যেকটিতে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থী জয়ী হওয়ার নজির রয়েছে। কিন্তু এবার সেই চিত্র ভিন্ন।

বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীরা এবার লড়বেন আলাদা হয়ে। সেই সমীকরণে ভোটের মাঠে বড় আধিপত্য বিএনপিরই বলা যায়। সাংগঠনিকভাবে শক্ত অবস্থানে থাকলেও নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী তার কতটা ছাপ রাখতে পারবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে বোদ্ধা মহলে। বিএনপির দুর্গ দখলে নিতেই মাঠে কাজ করছেন দলটির নেতাকর্মীরা।

কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া): এ আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ। বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সরকারের প্রথম মেয়াদের সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) থেকে রাজনীতির মাঠে আসা সালাহউদ্দিন আহমেদ এই আসনে একবারের জন্যও হারেননি। আওয়ামী লীগের ১৬ বছর বাদ দিলে তার আগের একটি নির্বাচনেও হারেননি তিনি।

রাজনৈতিক মামলাজনিত কারণে তিনি নিজে প্রার্থী হতে না পারলেও এ আসন থেকে প্রার্থী হয়েছিলেন তারই সহধর্মিণী হাসিনা আহমেদ। তিনিও হারেননি। এসব কারণে আসনটিতে সালাহউদ্দিন আহমেদকে মনে করা হয় ‘অপরাজেয়’। তার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী দলটির কক্সবাজার শহর শাখার আমীর ও সাবেক ছাত্রনেতা আবদুল্লাহ আল ফারুক। তিনি নিজে ও দলীয় কর্মীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

জামায়াত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, চকরিয়া-পেকুয়ায় তাদের ভোট ব্যাংক রয়েছে। ৫ আগস্টের পর তাদের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। সেই হিসেবে অন্য দলের প্রার্থী যত হেভিওয়েটই হোক না কেন, ভোটের মাঠে জেতার লক্ষ্যে তারা কাজ করে চলেছেন।

সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘চকরিয়া-পেকুয়াবাসী আমাকে ভালোবাসেন। আমারও ওনাদের প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা আছে। ভোটের মাঠেই তার প্রতিফলন হবে ইনশা আল্লাহ।’

এই আসনে এবি পার্টির অধ্যাপক ওয়াহিদুজ্জামান, জাতীয় পার্টির শামসুল আলম, ইসলামী আন্দোলনের মাওলানা মনির উল্লাহ, এনসিপির মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন, গণঅধিকার পরিষদের আব্দুল কাদের প্রাইম, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা সরওয়ার আলম প্রচারণায় রয়েছেন।

কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া): বিএনপি এ আসনে এখনো প্রার্থী ঘোষণা করেনি। তবে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান মাঠে কাজ করতে বলেছেন দাবি করে এখানে মাঠে তৎপরতা চালাচ্ছেন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ।

২০০১ সালের জোটবদ্ধ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল। তখন জামায়াতের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন দলটির বর্তমান সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক ছাত্রনেতা ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ। এবারও তিনিই জামায়াতের প্রার্থী। দলের কেন্দ্রীয় কার্যক্রম নিয়ে রাজধানীতে ব্যস্ত থাকলেও সুযোগ পেলেই এলাকায় আসছেন ও ভোটকেন্দ্রিক নানা কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন।

আসনটিতে চিরাচরিতভাবেই বিএনপির ভোট বেশি। বিএনপি এবার জামায়াতকে ছাড় দিচ্ছে না। তাই জামায়াতে ইসলামী সহজেই বৈতরণী পার হতে পারবে না বলে মনে করেন এলাকার লোকজন।

তবে বিএনপি থেকে কে প্রার্থী হচ্ছেন এ নিয়ে চলছে নানা জল্পনা। সালাহউদ্দিন আহমেদই এখানে প্রার্থী হচ্ছেন—এমন গুঞ্জনে অন্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের ঘুম হারাম হয়। সেই গুঞ্জন থেমে গেলে আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তারা। মনোনয়নের আশায় সাবেক সংসদ সদস্য আলমগীর মুহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ দীর্ঘদিন ধরেই মাঠে তৎপর রয়েছেন। তবে এলাকায় প্রচার আছে যে, সালাহউদ্দিন আহমেদের সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো নেই। যে কারণে তার মনোনয়ন পেতে বেগ পেতে হতে পারে।

অন্যদিকে, এ আসনে এনসিপির প্রার্থী হয়ে দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সদস্যসচিব ও চট্টগ্রাম বিভাগের সমন্বয়ক এস এম সুজাউদ্দিন নির্বাচনে মাঠে লড়বেন বলে প্রচার পাচ্ছে। তাছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা ওবাইদুল কাদের নদভী, নেজামে ইসলাম পার্টির কক্সবাজার জেলা শাখার নায়েবে আমির মাওলানা শওকত ওসমান কুতুবী ও এবি পার্টির এনামুল হক সিকদার এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অধ্যক্ষ মাওলানা জিয়াউল হকের নামও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু ভোটের মাঠে তাদের কার্যক্রম নেই বললেই চলে।

কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও): এ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী বিষয়ক সম্পাদক সাবেক সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। কাজল বলেন, এটি বিএনপির আসন হিসেবেই পরিচিত। তৃণমূলে বিএনপির কর্মী-সমর্থক বেশি। ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে ভোট দেওয়ার স্বপ্ন জাগ্রত হয়েছে। আমরা প্রচারণা শুরুর পর থেকেই ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ভোটারগণ বিএনপিকেই বিজয়ী করবেন বলে আমরা আশাবাদী।

এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কক্সবাজার সরকারি কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক ভিপি ও সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শহিদুল আলম বাহাদুর। তিনি ভিপি বাহাদুর নামেই বেশি পরিচিত। দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম মজবুত থাকায় নেতাকর্মীদের নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বাহাদুর।

এর বাইরে এবি পার্টির প্রার্থী হিসেবে সাবেক ছাত্রনেতা সরওয়ার সাঈদ, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির কক্সবাজার জেলা শাখার আমির মাওলানা আ হ ম নুরুল আলম হিলালী, ইসলামী আন্দোলনের জেলা সভাপতি ও রামু চাকমারকুল দারুল উলুম মাদ্রাসার মুহাদ্দিস মাওলানা আমিরুল ইসলাম মীর মাঠে রয়েছেন। 

কক্সবাজার-৪ (উখিয়া-টেকনাফ): এখানে জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক হুইপ শাহজাহান চৌধুরী একাধিক বার জিতেছেন। এবারও তিনি দলের মনোনয়ন পেয়েছেন। কিন্তু তাকে সরিয়ে জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুল্লাহকে প্রার্থী করতে ইতিমধ্যে বিক্ষোভ হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতিতে শাহজাহান চৌধুরীর প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠা টেকনাফের আব্দুল্লাহ ভোটের মাঠে আলাদা রাজনৈতিক বলয় তৈরি করেছেন।

বিশেষ করে টেকনাফে তার অনেক প্রভাব রয়েছে। মনোনয়ন দৌড়ে শাহজাহান চৌধুরীর পিছু পিছু থাকলেও দলের সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা করেন জানিয়ে দলীয় প্রার্থীর জয়ে সর্বশক্তি নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছেন তিনি।

এ আসনে জামায়াতে ইসলামী কখনো জিততে পারেনি। এবার এখানে জামায়াতের প্রার্থী হয়েছেন দলটির জেলা আমির অধ্যক্ষ নূর আহমেদ আনোয়ারী। তিনি টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) একাধিক বার নির্বাচিত চেয়ারম্যান। এলাকায় সাধারণ মানুষের কাছে তার জনপ্রিয়তাও যথেষ্ট। ইউপির সেই জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে তিনি এবার সংসদ নির্বাচনে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।

উখিয়া-টেকনাফে জামায়াতের দলীয় ভিত্তিও মজবুত। কিন্তু শাহজাহান চৌধুরী বা বিএনপির অন্য কোনো প্রার্থীর সঙ্গে তিনি কতটুকু পেরে উঠবেন, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে সংশয় আছে।

এই আসনে নেজামে ইসলামের হয়ে মাঠে নেমেছেন দলটির জেলা শাখার নায়েবে আমির মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াছিন হাবিব। তিনি হেফাজতে ইসলামের জেলা শাখার সদস্যসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।

এখানে এবি পার্টি থেকে প্রার্থী হতে চান দৈনিক ইনকিলাবের কক্সবাজার অফিস প্রধান ও দলের কেন্দ্রীয় নেতা শামসুল হক শারেক। তিনি এখানে নিজ উদ্যোগে এবি পার্টির কিছু কার্যক্রম জারি রেখেছেন। এনসিপির মনোনয়ন নিয়ে মাঠে নেমেছেন মোহাম্মদ হোসাইন নামের এক তরুণ। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের হাফেজ মাওলানা নুরুল হক নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।

জেলা বিএনপির সভাপতি শাহজাহান চৌধুরী বলেন, আমাদের দলীয় প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকরা মাঠে কাজ করছেন। মানুষের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। জামায়াতে ইসলামীর কক্সবাজার জেলা সেক্রেটারি জাহেদুল ইসলাম বলেন, জেলার চারটি আসনেই আমাদের প্রার্থীরা সাধারণ মানুষের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। আমরা দিনদিন উন্নতি করছি, জয়ের ব্যাপারেও আমরা আশাবাদী।

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন পেকুয়া উপজেলা সংবাদদাতা রেজাউল করিম রেজা ও টেকনাফ উপজেলা সংবাদদাতা জাহাঙ্গীর আলম)

ইত্তেফাক/এসএএস