পাহাড়ে বইছে শীতের আমেজ। শীত মানে গরম কাপড় পরা আর ধোঁয়া ওঠা গরম-গরম পিঠা-পুলির স্বাদ নেওয়া। শীতকালে গ্রাম-শহরের নারীরা নানা ধরনের পিঠা-পুলি বানিয়ে পরিবারের সদস্যদের খেতে দেন।
বর্তমানে আধুনিক প্রযুক্তির যুগে গ্রাম কিংবা শহর—সবখানেই পিঠা-পুলির উৎসবে কিছুটা ভাটা পড়েছে। যুগের বিবর্তনে নানা ধরনের বেকারি পণ্য, ফাস্টফুডের কারণে পিঠা-পুলি বানিয়ে সময় নষ্ট করেন না নারীরা। তবে এখনো পিঠার চাহিদা ব্যাপক রয়েছে। শীত মৌসুম মানেই ‘ভাপা পিঠা’। ভাপা পিঠা খেতে ভালোবাসেন সব বয়সী মানুষ। সাদা চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হয় মজাদার এই ‘ভাপা পিঠা’।
পাহাড় যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনি এখানকার খাবারেও রয়েছে এমন ভিন্নতা যা সারাদেশের মানুষের নজর কাড়ে। বলছি কালো ভাপা পিঠার কথা। তবে পাহাড়িরা এটিকে কালো ভাপা পিঠা বললেও মূলত পিঠাটি দেখতে কিছুটা কফি রঙের মতো। জুমে উৎপাদিত বিনি চাল দিয়ে পাহাড়ি নারীরা এ পিঠা তৈরি করে থাকেন।
শীত মৌসুমে পাহাড়ি নারীরা কয়েক বছর ধরে রাঙ্গামাটি শহরের বিভিন্ন স্থানে ভাসমান দোকান বসিয়ে কালো ভাপা পিঠা তৈরি করে বিক্রি করছেন। প্রথমে এই পিঠা জনপ্রিয়তা না পেলেও ধীরে ধীরে এর স্বাদ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। নির্ধারিত ভাসমান দোকানগুলোতে দাঁড়িয়ে পাহাড়ি-বাঙালি সকলে এ পিঠা ক্রয় করে রসনা বিলাস করছেন। বাইরে থেকে আগত পর্যটকরা এ পিঠার সন্ধানে ছুটে আসছেন এবং নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে এর স্বাদ গ্রহণ করছেন।
পাহাড়ের জুমে উৎপাদিত বিনি চাল সংগ্রহ করে ধুয়ে পরিষ্কার করে শুকানো হয়। শুকানোর পর মেশিনে গুঁড়া করা হয়। গুঁড়া হওয়া চালগুলো হালকা পানি এবং লবণ দিয়ে মাখানোর পর সেখানে কোরানো নারকেল, পাটালি গুঁড়া অথবা খেজুরের গুড় মিশিয়ে ভাপে দেওয়া হয় এবং কিছুক্ষণ পর নামিয়ে গরম-গরম পরিবেশন করা হয়। এই পিঠাগুলো কিছুটা আঁঠালো হলেও অন্যান্য চালের গুঁড়ার পিঠার চেয়ে দ্বিগুণ সুস্বাদু।
রাঙ্গামাটি জেলা শহরের স্টেডিয়াম এলাকা এবং আসামবস্তি–কাপ্তাই সংযোগ সড়কে শীতের বিকেলে পাহাড়ি নারীরা কালো ভাপা পিঠা বিক্রি করেন। প্রতিদিন সেখানে অসংখ্য মানুষ ভিড় করেন এবং গরম গরম পিঠা খান। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পিঠা বিকিকিনি চলে। দোকানগুলোতে সাদা ভাপা পিঠা, চিতই পিঠাসহ নানা ধরনের পিঠা বানানো হয়।
স্টেডিয়াম এলাকার ভাসমান পিঠা বিক্রেতা পরানী চাকমা বলেন, বিনি চালের কালো ভাপা পিঠার স্বাদ বেশি। সে কারণে মানুষজন এ পিঠা বেশি খেয়ে থাকে। সাদা ভাপা পিঠা একটু শক্ত হলেও এ পিঠা কিছুটা নরম হয়।
তিনি আরও বলেন, এ পিঠা ব্যতিক্রমী এবং স্বাদ বেশি হওয়ায় পর্যটক ও স্থানীয়রা বেশি পছন্দ করেন। প্রতিপিস পিঠা ২০ টাকা করে বিক্রি করেন বলে জানান এই পিঠা বিক্রেতা।
পিঠা বিক্রেতা সুবর্ণা চাকমা বলেন, প্রতিদিন ৫–৬ কেজি চালের পিঠা তৈরি করি এবং ২–৩ হাজার টাকার পিঠা বিক্রি হয়। পিঠা বিক্রি করে ভালো লাভ হওয়ায় বেশ কয়েক বছর ধরে শীতকালে কালো ভাপা পিঠা তৈরি করেন। পাশাপাশি অন্যান্য পিঠাও তৈরি করেন তিনি।
কালো ভাপা পিঠা খেতে আসা পর্যটক ফরিদা বেগম বলেন, ঢাকা থেকে বেড়াতে এসেছি। লোকমুখে কালো ভাপা পিঠার কথা শুনেছি। খেতে সত্যিই দারুণ লেগেছে।
তার স্বামী আশরাফুল আলম বলেন, এমন স্বাদের পিঠা জীবনে খুব কম খেয়েছি। সারাজীবন মনে থাকবে।
স্থানীয় নাজিয়া শারমীন বলেন, বাচ্চারা কালো ভাপা পিঠা খেতে খুব পছন্দ করে। তাই শীতকালে প্রতিদিন বিকেলের নাস্তা হিসেবে কালো ভাপা পিঠা কিনে বাড়ি নিয়ে যান।
দিন যতই গড়াচ্ছে, স্বাদে-গুণে অনন্য এ কালো ভাপা পিঠার গল্প চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। জুমের বিনি চালের কালো ভাপা পিঠা সারাদেশে আলাদা সুখ্যাতি অর্জন করবে—এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দেররাঙ্গামাটি
