হাদিকে হত্যা, মা-বোন-স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি ছিল

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৫, ২২:১৩

রাজধানীর বিজয়নগর এলাকায় ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে দিনে দুপুরে প্রকাশ্যে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। এই ঘটনার পর গত নভেম্বরে হাদির দেওয়া একটি ফেসবুক পোস্ট আলোচনায় এসেছে।

যেখানে তিনি লিখেছিলেন, ‘গত তিন ঘণ্টায় আমার নম্বরে আওয়ামী লীগের খুনিরা অন্তত ৩০টা বিদেশি নম্বর থেকে কল ও টেক্সট করেছে। যার সামারি হলো- আমাকে সর্বক্ষণ নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। তারা আমার বাড়িতে আগুন দেবে। আমার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণ করবে এবং আমাকে হত্যা করবে।’

এই পরিস্থিতিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুক্রবার দুপুরে দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন হাদি।

পুলিশ বলছে, জুমার নামাজের পর তিনি মতিঝিল ওয়াপদা মাদ্রাসা (জামিয়া দারুল উলুম মাদ্রাসা) এলাকায় নির্বাচনী জনসংযোগ শেষ করে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশায় করে তিনি বাংলা মোটরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। রিকশায় তার দলীয় সহকর্মী রাফি ছিলেন। বিজয়নগর কালভার্ট রোডে রিকশাটি আসার পর পিছন থেকে মোটরসাইকেলে আসা দুজন তাকে আগে থেকে অনুসরণ করছিল। মোটরসাইকেলটি রিকশার পাশাপাশি চলন্ত অবস্থায় খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে এক রাউন্ড গুলি করে। গুলি তার বাম চোয়াল দিয়ে ঢুকে কানের পিছনের অংশে থেকে যায়। এতে তিনি মারাত্মক আহত হন। দ্রুত তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন সূত্র বলছে, এ অবস্থায় হাদিকে গুলির ঘটনা দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কারণ, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ ওসমান হাদির রাজনৈতিক অবস্থান সামনে আসছে। পূর্ব পরিকল্পিতভাবে হাদিকে প্রাণনাশের উদ্দেশ্যে এ হামলা চালানো হতে পারে। এ ঘটনায় জড়িতরা ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী হতে পারে। সেই সঙ্গে রাজনৈতিক ব্যক্তিগত বিরোধের জের ধরে স্বার্থবাদী গোষ্ঠী এতে জড়িত থাকতে পারে। 


ঘটনাস্থলের চিত্র

কালভার্ট রোডের যে স্থানে হাদির ওপর গুলি চালানো হয়েছে, সেই ঘটনাস্থলটি রশি দিয়ে ঘিরে রাখে র‌্যাব, পুলিশ ও ডিবিসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করছেন। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ বলেন, ঘটনার তদন্ত চলছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে যাচাই করে ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। 

সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেলো 

ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনার দুটি ভিডিও ফুটেজ এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ফুটেজের তথ্য বলছে, তাকে খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়। পুলিশের একাধিক টিম ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। ঘটনাস্থলের কাছাকাছি একটি ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, শুক্রবার দুপুর ২টা ২১ মিনিটের দিকে গুলির শব্দ শোনা যায়। এর কয়েক সেকেন্ড পর একটি মোটরসাইকেলকে সড়ক দিয়ে দ্রুত পালিয়ে যেতে দেখা যায়। এরপর আশপাশের লোকজন আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

অন্য আরেকটি সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় করে যাচ্ছিলেন হাদি। এ সময় ওই অটোরিকশাটির পিছু নেয় একটি মোটরসাইকেল। রিকশাটির ডান পাশ ঘেঁষে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে বসা একজন হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এরপর মোটরসাইকেলটি দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে।


হামলাকারীরা হাদির নির্বাচনী প্রচারণায়  

হাদির নির্বাচনী প্রচারণার ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। একটি ছবিতে দেখা যায়, মতিঝিল ওয়াপদা মাদ্রাসার সামনে ফুটপাতে কাঠের একটি টুলের ওপর হাদি বসে আছেন। পথচারীদের সঙ্গে হাত মেলানোর সময় তার পাশে কালো মাস্ক ও রয়েল ব্লু রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত এক যুবককে বসে থাকতে দেখা যায়। যুবকের হাতে সোনালী রঙের চেইন ও নীল রঙের ডায়ালযুক্ত ঘড়ি দেখা যায়। চোখে পাওয়ারফুল চশমা। ওই যুবকের পরনের পোশাকের সাথে গুলি করার সময় মোটরসাইকেল চালকের পোশাকের মিল রয়েছে।

আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, রয়েল ব্লু রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত ও মুখে কালো মাস্ক এবং গলায় খয়েরি প্রিন্টের চাদর ঝুলানো যুবক হাদির নির্বাচনী প্রচারণায় লিফলেট বিতরণ করছে। ওই যুবকের পোশাকের সঙ্গে মোটরসাইকেলের পেছনে আরোহীর আসনে বসে থেকে হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি করা যুবকের মিল রয়েছে। 

যা বললেন ডিএমপি কমিশনার

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার শেখ মো. সাজ্জাত আলী বলেন, ওসমান হাদিকে গুলি করা সন্ত্রাসীদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। তিনি বলেন, ওসমান বিন হাদি দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। তার অবস্থা খুবই গুরুতর। তার উপর হামলাকারী সন্ত্রাসীরা যেখানেই লুকিয়ে থাকুক, তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় নিয়ে আসা হবে।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তারের জন্য পুলিশের পাশাপাশি  গোয়েন্দা, র‌্যাবসহ সবাই কাজ করছে। 

ঢাকা মেডিকেলে যেভাবে চিকিৎসা হলো 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় আনার পর ওসমান হাদির অবস্থা ছিল অত্যন্ত সংকটাপন্ন। শুক্রবার বিকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, তার (হাদি) অবস্থা আশঙ্কাজনক। তাকে লাইফ সাপোর্ট দেওয়া হয়েছে। ঢামেক হাসপাতালে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। ছবি: সংগৃহীত

দায়িত্বে থাকা এক চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে আনার কিছুক্ষণের মধ্যেই তার কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট হয়। শকে চলে যাওয়ায় দ্রুত সিপিআর দেওয়ার পর সাময়িকভাবে রক্তচাপ কিছুটা স্থিতিশীল হয়। এরপরও পরিস্থিতিকে অত্যন্ত গুরুতর বলে বর্ণনা করেছেন চিকিৎসকেরা বলেন, ওসমান হাদিকে আইসিইউতে ভর্তি করে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো তার চিকিৎসায় সব ধরণের জোর প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাৎক্ষণিক তার অপারেশন কার্যক্রম চালানোর জন্য রক্তের প্রয়োজন হয়। তার রক্তের গ্রুপ বি নেগেটিভ। রক্ত সংকটের কারণে তাৎক্ষণিক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে বি নেগেটিভ রক্ত ব্যবস্থা করে দেয়। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মোস্তাক আহমেদ  বলেন, ওসমান হাদিকে যখন জরুরি বিভাগে আনার পর তার অবস্থা ছিল খুবই আশঙ্কাজনক। পরে তাকে সিপিআর দেওয় হয়। 

লাইফ সাপোর্টে হাদি 

হাদির অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের চিকিৎসকরা। তার মাথায় প্রবেশ করা গুলি বাম কানের ওপর দিয়ে ঢুকে ডান দিকে বের হয়ে গেছে। যা গুরুতর মস্তিষ্ক আঘাতের কারণ হয়েছে। মাথার খুলি খুলে রাখা হয়েছে। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সামনে চিকিৎসকরা সাংবাদিকদের এসব কথা জানান। এসময় হাসপাতালে পরিচালক, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, ঢামেক নিউরো সার্জারি বিভাগের চিকিৎসারা উপস্থিত ছিলেন। 

ঢামেক নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. জাহিদ রাহান বলেন, ‘গুলিটি মাথার ভেতর দিয়ে ক্রস করে গেছে। এতে ম্যাসিভ ব্রেন ইনজুরি হয়েছে এবং ব্রেইন স্টেমেও আঘাত লেগেছে। বর্তমানে তাকে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসে রাখা হয়েছে। জীবনের ন্যূনতম চিহ্ন এখনো আছে, তিনি পুরোপুরি নিস্তেজ হয়ে যাননি। তবে অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন। আমরা নিশ্চয়তা নিয়ে কিছু বলতে পারছি না।’

তিনি আরও জানান, বাম দিকে যেখানে গুলিটি বের হয়েছে, সেই অংশের খুলির হাড় অপসারণ করে মস্তিষ্কের চাপ কমানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। মাথার ভেতরের রক্ত ও জমে থাকা ফ্লুইড অপসারণ করা হয়েছে। 

এসময় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী মোহাম্মদ সাইদুর রহমান জানান, ‘হাদিকে যখন ঢামেকে আনা হয়, তার জিসি স্কোর ছিল মাত্র তিন। পরে তিনি একবার কার্ডিয়াক অ্যারেস্টে যান। তার মস্তিষ্কে চাপ বেড়ে যাওয়ায় ডিকমপ্রেশন ও ক্রেনিওটমি করা হয়। তবে অবস্থার দ্রুত ওঠানামার কারণে তাকে স্টেবল রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।’

তিনি বলেন, আগামী ৭২ ঘণ্টা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এই অবস্থায় কোনো সুস্পষ্ট চিকিৎসা সিদ্ধান্ত দেওয়া বা আশার কথা বলা সম্ভব নয়।

সন্ধ্যার পর এভারকেয়ার হাসপাতালে 

ঢামেকে সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসক দল জানায়, সন্ধ্যার পর হাদির নাক ও গলা দিয়ে তীব্র রক্তক্ষরণ শুরু হলে সেটাও ম্যানেজ করতে হয়। বর্তমানে তিনি ওষুধের সহায়তায় ‘ ‘হেমোডাইনামিকালি স্টেবল’, তবে অবস্থাটি দীর্ঘস্থায়ী নয়। পরিবারের অনুরোধে তাকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। আইসিইউ সাপোর্টেড অ্যাম্বুলেন্সে করে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

চিকিৎসকদল সংবাদ সম্মেলন করার ১০ মিনিট পর হাদিকে একটি সরকারি আইসিইউ বিশিষ্ট এ্যাম্বুলেন্স করে এভারকেয়ার হাসপাতালে উদ্দেশ্য নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী যা বলছেন 

হাদিকে গুলির ঘটনার পর প্রাথমিক তদন্তে পাওয়া তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্ট এক পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকা দিয়ে রিকশায় চড়ে যাওয়ার সময় মোটরসাইকেলে করে দুই ব্যক্তি এসে হাদিকে গুলি করে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। 

ঘটনার সময় সময় ওসমান হাদির পেছনের রিকশায় ছিলেন তার ঘনিষ্ঠ মো. রাফি।

ওসমান হাদির গুলিবিদ্ধ হওয়ার বর্ণনা দিয়ে রাফি বলেন, ‘জুম্মার নামাজ শেষে আমরা রিকশায় করে হাইকোর্টের দিকে আসছিলাম। বিজয়নগরে আসতেই একটি মোটরসাইকেলে দুজন এসে হাদি ভাইয়ের উপর গুলি ছুঁড়ে পালিয়ে যায়। এ সময় আমি ভাইয়ের পেছনের রিকশায় ছিলাম।’

ওই এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাকর্মী লুৎফর রহমান জানান, দুপুরের দিকে বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় পানির ট্যাংকির দিক থেকে মোটরসাইকেলে করে এসে দুই যুবক একজনকে গুলি করে। পরে জানতে পারি তিনি হাদি। গুলি করে তারা দ্রুত আবার সেদিকে চলে যায়।

ওই এলাকায় দায়িত্বরত আনসার সদস্য ইমরান হোসেন হদয় বলেন, ‘হঠাৎ গুলির শব্দ পাই। প্রথমে মনে হয়, টায়ার ব্লাস্ট হলো। এরপরই মানুষের দৌড়াদৌড়ি দেখে দৌড়ে এসে দেখি, গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন রিকশায় পড়ে আছেন। তার সঙ্গে আরেকজন ছিলেন। পরে তাকে হাসপাতালে পাঠানো হয়।’

ডিএমপির গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, বেলা ২টা ২১ মিনিটে একটি মোটরসাইকেলে দুর্বৃত্তরা এসে হাদিকে লক্ষ্য করে গুলি ছোঁড়ে। 

নিরাপত্তা জোরদার

এদিকে হাদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর সেখানে দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা তার খোঁজ নিতে যান। সঙ্গে থাকা রাজনৈতিক সহকর্মীরা ঢাকা মেডিকেলের সামনে জানান, হাদির জন্য বি নেগেটিভ রক্ত লাগবে। এ সময় যৌথ বাহিনীর সদস্যরা পুরো এলাকায় নিরপত্তা ব্যবস্থায় ছিল। এ ঘটনায় পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারাদেশে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। এই নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে।
 
ঘটনার আগে নিরপত্তাহীনতায় ছিলেন হাদি 

এর আগে হাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছিলেন, গত নভেম্বর মাসে দেশি-বিদেশি ৩০টি নম্বর থেকে বিভিন্ন ধরনের হুমকি পেয়েছেন তিনি। ১৪ নভেম্বর ফেসবুকে একটি পোস্টে তিনি জানিয়েছিলেন, তাকে হত্যা, তার বাড়িতে আগুনসহ তার মা, বোন ও স্ত্রীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়া হয়।

হাদির ফেসবুক পোস্ট নতুন করে আলোচনায়। কোলাজ: ইত্তেফাক  

সম্প্রতি মতিঝিল, শাহজাহানপুর, পল্টন, রমনা ও শাহবাগ থানা এলাকা নিয়ে গঠিত ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছিলেন হাদি। সেজন্য প্রতি শুক্রবারে তিনি জনসংযোগ করতেন।

হাদির একজন সহযোদ্ধা বলেন, জুমার নামাজের পর মসজিদে তাদের লিফলেট বিলি কর্মসূচি ছিল। কথা ছিল লিফলেট বিলি শেষে সবাই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জড়ো হয়ে দুপুরের খাবার খাবেন, আলোচনা করবেন। এর মধ্যেই হাদির ওপর হামলার খবর আসে।

যেভাবে আলোচনায় আসেন ওসমান হাদি

শরীফ ওসমান বিন হাদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ২০১০-২০১১ শিক্ষাবষের্র শিক্ষার্থী ছিলেন। ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ভূমিকার জন্য তিনি পরিচিতি পান। হাদির গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটিতে। বাবা ছিলেন মাদ্রাসার শিক্ষক। নেছারাবাদ কামিল মাদ্রাসায় হাদির শিক্ষাজীবনের শুরু, পরে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

এক সময় ইংরেজি শেখার কোচিং সেন্টার সাইফুরস এ শিক্ষকতা করেছেন হাদি। সর্বশেষ ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষকতা করছিলেন বলে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা জানিয়েছেন।

হাদির ঘনিষ্ঠজনদের দাবি, জুলাই অভ্যুত্থানের আগে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না হাদি; তিনি সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করতেন, একাধিক বইও লিখেছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ওসমান হাদির হাত ধরে গড়ে ওঠে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্লাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ জানিয়ে তার ঘনিষ্ঠরা বলেন, ‘সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণ’ সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য। এছাড়া এবারের ডাকসু নির্বাচনে শিবির নেতৃত্বাধীন প্যানেল থেকে ভোট করে ইনকিলাব মঞ্চের ফাতিমা তাসনিম জুমা মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিষয়ক সম্পাদক নির্বাচিত হন।

হাদিকে দেখতে ঢামেকে মির্জা আব্বাস

হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পেয়ে একই আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী মির্জা আব্বাস তাকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। বিকেল ৪টায় ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান। তবে হাসপাতালে প্রবেশের সময় তাকে লক্ষ্য করে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীরা বিভিন্ন স্লোগান দেয়।

হাসপাতালে হাসনাত ও জারা 

গুলিবিদ্ধ হাদিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাকে দেখতে হাসপাতালে ছুটে গেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সিনিয়র যুগ্ম সদস্যসচিব ডা. তাসনিম জারা। এদিকে, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, হাদির মতো আমাদের জীবনেরও শঙ্কা রয়ছে। আমাদেরকেও মেরে ফেলা হতে পারে। তবে আমরা জীবন দিয়ে লড়াই করে যেতে চাই।

ঢাবিতে ছাত্রদলের বিক্ষোভ মিছিল 

তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ মিছিল করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে পাঁচটায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ  হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে এই বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলটি জাতীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন রাস্তা প্রদক্ষিণ করে পরবর্তীতে আবার ঢামেকের জরুরি বিভাগের সামনে গিয়ে শেষ হয়। মিছিলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব, সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দীন নাসির, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

ইত্তেফাক/এপি