সুদানের জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীদের ড্রোন হামলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৪ জন শান্তিরক্ষা হতাহত হয়েছেন। গতকাল রবিবার আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) থেকে হতাহত বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের নাম প্রকাশ করা হয়। ১৪ জন শান্তিরক্ষীর মধ্যে ছয় জন শহিদ এবং আট জন আহত হয়েছেন।
গত শনিবার স্থানীয় সময় বিকাল ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিটের মধ্যে সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের ঘাঁটিতে সন্ত্রাসীরা অতর্কিত হামলা চালায়। এই সংবাদে শহিদদের গ্রামের বাড়িতে পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। এই ছয় জনকে নিয়ে শান্তিরক্ষা মিশনে সেনাবাহিনীর ১৩৭ জন শহিদ হয়েছেন। এছাড়াও নৌবাহিনীর চার জন, বিমান বাহিনীর ৯ জন এবং পুলিশ বাহিনীর ২৪ জনসহ গতকাল পর্যন্ত মোট ১৭৪ জন শান্তিরক্ষা মিশনে শহিদ হন। আর আহত হয়েছেন মোট ২৮৬ জন। আহতদের মধ্যে সেনাবাহিনীর সদস্য ২৫৫ জন, নৌবাহিনীর ৯ জন, বিমান বাহিনীর সাত জন ও পুলিশ সদস্য ১৫ জন।
শান্তিরক্ষায় জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা, অবকাঠামো উন্নয়ন আত্মমানবতার সেবা প্রদানসহ বিভিন্ন কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অকুতোভয় বীর সেনানিরা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নিজেদের আন্তরিকতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, পেশাগত দক্ষতা প্রদর্শনের মাধ্যমে আস্থার প্রতীক হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন। এ কারণে শান্তিরক্ষা প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে রয়েছে।
গতকাল আইএসপিআর জানায়, নিহত শান্তিরক্ষীরা হলেন—নাটোরের বাসিন্দা করপোরাল মো. মাসুদ রানা, কুড়িগ্রামের বাসিন্দা সৈনিক মো. মমিনুল ইসলাম ও সৈনিক শান্ত মণ্ডল, রাজবাড়ীর বাসিন্দা সৈনিক শামীম রেজা, কিশোরগঞ্জের বাসিন্দা মেস ওয়েটার মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম এবং গাইবান্ধার বাসিন্দা লন্ড্রি কর্মচারী মো. সবুজ মিয়া।
আহত শান্তিরক্ষীরা হলেন—কুষ্টিয়ার বাসিন্দা লেফটেন্যান্ট কর্নেল খোন্দকার খালেকুজ্জামান, দিনাজপুরের বাসিন্দা সার্জেন্ট মো. মোস্তাকিম হোসেন, ঢাকার বাসিন্দা করপোরাল আফরোজা পারভিন ইতি, বরগুনার বাসিন্দা ল্যান্স করপোরাল মহিবুল ইসলাম, কুড়িগ্রামের বাসিন্দা সৈনিক মো. মেজবাউল কবির, রংপুরের বাসিন্দা সৈনিক মোসা. উম্মে হানি আক্তার, মানিকগঞ্জের বাসিন্দা সৈনিক চুমকি আক্তার এবং নোয়াখালীর বাসিন্দা সৈনিক মো. মানাজির আহসান।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সুদানের আবেই এলাকায় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের আওতাধীন কাদুগলি লজিস্টিক বেসে গত শনিবার স্থানীয় সময় বিকাল ৩টা ৪০ মিনিট থেকে ৩টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী ড্রোন হামলা চালায়। এতে দায়িত্বে থাকা ছয় জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী নিহত হন এবং আট জন আহত হন।
আইএসপিআর জানায়, গুরুতর আহত সৈনিক মো. মেজবাউল কবিরের অস্ত্রোপচার সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি বর্তমানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। বাকি সাত জনকে উন্নত চিকিত্সার জন্য হেলিকপটারযোগে স্থানান্তর করা হয়েছে এবং তারা সবাই শঙ্কামুক্ত রয়েছেন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এই নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, শহিদ শান্তিরক্ষীদের আত্মত্যাগ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারের এক উজ্জ্বল ও গৌরবময় নিদর্শন হয়ে থাকবে। একই সঙ্গে শহিদদের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা এবং আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করা হয়েছে।
জাতিসংঘ মহাসচিবের তীব্র নিন্দা, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইইউর শোক
সুদানে জাতিসংঘের এক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলায় বাংলাদেশের ছয় শান্তিরক্ষী নিহতের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। শনিবার বিবৃতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব বলেন, সুদানের কাদুগলিতে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীর লজিস্টিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে নৃশংস ড্রোন হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষীদের লক্ষ্য করে হামলা আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।
এদিকে সুদানে নিহত ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্যের পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে ঢাকাস্থ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) দূতাবাস। গতকাল এক বার্তায় মার্কিন দূতাবাস সুদানে নিহত সেনাদের পরিবার, বন্ধু ও সহকর্মীদের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে আহত আট জনের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছে। দেশটি জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা অভিযানে বাংলাদেশের দীর্ঘ অবদানকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছে।
ছয় বাংলাদেশি শান্তিরক্ষা বাহিনীর সদস্যের পরিবারের প্রতি সমবেদনা এবং আহত আট জনের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছে যুক্তরাজ্য। ব্রিটিশ হাইকমিশন এক বার্তায় বলেছে, বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকারকে সমর্থনের ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য অবিচল রয়েছে।
ঢাকার ইইউ দূতাবাস নিহতদের পরিবার, বন্ধু-বান্ধব এবং সহকর্মীদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়ে বলেছে, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষায় অমূল্য অবদান এবং বিশ্ব জুড়ে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের সাহস, নিষ্ঠা এবং পেশাদারিত্বের জন্য ইইউ প্রতিনিধিদল বাংলাদেশের প্রতি কৃতজ্ঞ। অন্যদিকে ছয় সেনা নিহতের ঘটনায় সমবেদনা জানিয়েছে ঢাকাস্থ ইতালি দূতাবাসও।

