সাভারের পরিত্যক্ত পৌর কমিউনিটি ভবন যেন ‘কিলিং স্পট’

  • গত কয়েক মাসে উদ্ধার ৩ মরদেহের মেলেনি পরিচয়
আপডেট : ২১ ডিসেম্বর ২০২৫, ১৬:৩৮

সাভারের ব্যস্ততম কলেজ রোডের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সাভার পৌর কমিউনিটি সেন্টারের বিশাল জরাজীর্ণ ভবন। এক সময় যা ছিল উৎসব আর কোলাহলের কেন্দ্রবিন্দু, সেটিই এখন স্থানীয়দের কাছে এক বিভীষিকার নাম। সাভার মডেল থানা থেকে মাত্র ৩০০-৪০০ গজের দূরত্বে অবস্থিত এই পরিত্যক্ত ভবনটি এখন যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক মাসের ব্যবধানে এখান থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার হওয়ার ঘটনায় পুরো এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

সর্বশেষ গত শুক্রবার দুপুরে এই ভবনের দ্বিতীয় তলার টয়লেট থেকে অজ্ঞাত পরিচয় এক যুবকের আগুনে পোড়া ও অর্ধগলিত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের অবয়ব এতটাই বিকৃত ছিল যে তাৎক্ষণিকভাবে চেনার কোনো উপায় ছিল না। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পাঁচ-সাত দিন আগে তাকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে প্রমাণ নষ্টের উদ্দেশ্যে শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বেরিয়ে আসছে আগের লোমহর্ষক সব কাহিনী।

ঠিক এর কিছুদিন আগে গত ১২ অক্টোবর এই একই ভবনের দ্বিতীয় তলা থেকে এক নারীর জবাই করা অর্ধনগ্ন মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো তদন্ত চলছে। তারও আগে ২৯ আগস্ট হাত-পা বাঁধা অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিল এক যুবকের পচাগলা লাশ। অবাক করার বিষয় হলো, দীর্ঘ চার মাস পার হয়ে গেলেও সেই প্রথম মরদেহের পরিচয় এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি পুলিশ, উন্মোচিত হয়নি হত্যার রহস্যও। থানার এত কাছে হয়েও কীভাবে অপরাধীরা বারবার এই ভবনটিকে নির্বিঘ্নে ব্যবহার করছে, তা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে এখন তীব্র ক্ষোভ আর প্রশ্ন দানা বেঁধেছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, এলাকাটি এখন রীতিমতো মৃত্যুপুরী। সন্ধ্যা নামলেই এখানে মাদকসেবী ও ছিনতাইকারীদের অভয়ারণ্য তৈরি হয়। দীর্ঘ দেড় যুগ ধরে জেলা পরিষদ ও পৌরসভার মালিকানা সংক্রান্ত মামলার গ্যাঁড়াকলে আটকে থাকা ভবনটি গত ৫ আগস্টের পর থেকে সম্পূর্ণ অরক্ষিত হয়ে পড়েছে। আগে এখানে পুলিশের একটি ক্যাম্প থাকলেও গণঅভ্যুত্থানের সময় সেখানে অগ্নিসংযোগের পর সেটি পরিত্যক্ত হয়ে যায়, আর সেই সুযোগেই সেখানে আড্ডাস্থল বানিয়েছে খুনি ও অপরাধী চক্র।

এসব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরাফাতুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, যে মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়েছে তা অর্ধগলিত এবং বিকৃত। দেখে কোনোভাবেই চেনার উপায় নেই। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, অন্য কোথাও হত্যার পর গুম করার উদ্দেশে মরদেহ এই পরিত্যক্ত ভবনে ফেলে রেখে যায় দুর্বৃত্তরা। প্রতিটি ঘটনায় সাভার মডেল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা দায়ের করেছে। আশা করছি, তদন্তে এসব হত্যাকাণ্ডের রহস্যও জানা যাবে। পুলিশ এ হত্যাকাণ্ডগুলো নিয়ে কাজ করছে বলে জানান তিনি।

সবচেয়ে বেশি আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন সাভার কলেজের শিক্ষার্থীরা। কলেজের ঠিক সামনেই এমন একটি অপরাধের আখড়া থাকায় যাতায়াতের সময় তারা সব সময় নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। শিক্ষার্থীদের মতে, দিনের আলোতেও এই পরিত্যক্ত ভবনের পাশ দিয়ে হাঁটতে গা ছমছম করে। একের পর এক খুনের ঘটনায় অনেক অভিভাবক এখন সন্তানদের কলেজে পাঠাতেও দ্বিধাবোধ করছেন। প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন নৃশংসতা চললেও ভবনটি ঘিরে কোনো স্থায়ী নিরাপত্তা ব্যবস্থা না নেওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট দেখা দিচ্ছে।

ইত্তেফাক/এসএএস