পাহাড়ি নারীদের হাতের কারুশিল্পে বৃত্তি ও সংস্কৃতির মিলন ‘পিনন-হাদি’

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২৫, ১২:০৫

পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি নারীদের হাতে তৈরি ‘পিনন’ ও ‘হাদি’ শুধু পোশাক নয়; এটি তাদের সংস্কৃতি, পরিচয় আর স্বাবলম্বিতার প্রতীক। কোমর পেঁচানো স্কার্টের মতো নিচের অংশ ‘পিনন’ এবং ওড়নার মতো উপরের অংশ ‘হাদি’—এই দুইটি বস্ত্র নারীদের দৈনন্দিন ও উৎসব জীবনের অংশ। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মেয়েরা বিয়ের আগে এই পোশাক বোনার কৌশল শিখে, যা তাদের ঐতিহ্য ও সাংসারিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত।

হাতের তাঁতে, রেশমি সূতায় নিপুণ কারুকাজ করে বানানো এই পোশাক এখন শুধু ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য নয়, বাণিজ্যিক আকারেও গড়ে উঠেছে। বিজু, বৈসু, সাংগ্রাইয়ের মতো উৎসবের সময় পিনন-হাদির চাহিদা সর্বাধিক থাকে। পাহাড় সীমান্ত ছাড়িয়ে সমতল অঞ্চলে এবং বিদেশেও এর চাহিদা দিনদিন বাড়ছে।

রাঙ্গামাটি শহরের বনরূপা বাজারে প্রতি সপ্তাহে শনিবার ও বুধবার পাহাড়ি নারী উদ্যোক্তারা তাদের পিনন-হাদি সাজিয়ে বসেন। ভোর থেকে নানা রঙে, সূক্ষ্ম নকশায় বোনা পোশাকের পসরা সাজিয়ে বিক্রি শুরু করেন। সাধারণ একটি পিনন-হাদির দাম ৪–৫ হাজার টাকা, আকর্ষণীয় ডিজাইনের দাম ১০–৩০ হাজার টাকা। বিশেষ বিয়ে বা পার্টির জন্য তৈরি পোশাকের দাম কখনো ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়।

মনিকা চাকমা, একজন পিনন-হাদি কারিগর, বলেন, “কোমর তাঁতে হাতে বোনা নকশা এবং রঙের সংমিশ্রণই মূল আকর্ষণ। প্রতিটি পিসে অনেক শ্রম ও সৃজনশীলতা লাগে।” অন্য উদ্যোক্তা চিচিকো চাকমা জানান, “আমরা আগে শুধু নিজেদের জন্য বানাতাম। এখন ফেসবুক ও পর্যটকদের মাধ্যমে অর্ডার পাই। এই আয় দিয়ে আমরা সন্তানদের পড়াশোনা ও সংসারের খরচ চালাই।”

স্থানীয় কারিগরদের হাতে তৈরি এই পোশাক কক্সবাজার, ঢাকা ও চট্টগ্রামেও পৌঁছে যাচ্ছে। তবে সুতোর দাম, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং বিপণন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা অনেক নারী উদ্যোক্তাকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন রাঙ্গামাটি জেলা কার্যালয় এই নারীদের প্রশিক্ষণ ও ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে সহায়তা করছে। উদ্যোক্তারা আশাবাদী—সঠিক সহায়তা পেলে এই কারুশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছাতে পারবে।

‘পিনন-হাদি’ এখন শুধু একটি পোশাক নয়, পাহাড়ি নারীদের জন্য জীবনধারার এক উপায়, আত্মসম্মান ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার প্রতীক।

ইত্তেফাক/এএইচপি