যে ৪ কারণে শান্তি প্রক্রিয়ায় ধীরগতি অবলম্বন করছে নেতানিয়াহু

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:১৮

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সাম্প্রতিক যুক্তরাষ্ট্র সফর এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার বৈঠক গাজা যুদ্ধবিরতি নিয়ে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। সফরে ট্রাম্পের কাছ থেকে ‘বীর’ খেতাব পেলেও মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরে নেতানিয়াহুর ভূমিকা নিয়ে গভীর অসন্তোষ বিরাজ করছে। 

হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তাদের মতে, গত অক্টোবরে প্রস্তাবিত ২০ দফার যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নেতানিয়াহু ইচ্ছাকৃতভাবে ‘ধীরগতি’ নীতি অনুসরণ করছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, মূলত নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ রক্ষা এবং হামাসের বিরুদ্ধে সুবিধাজনক সময়ে পুনরায় যুদ্ধ শুরুর পথ খোলা রাখতেই তিনি এই কৌশল অবলম্বন করছেন। গাজায় ত্রাণ প্রবেশে বাধা দেওয়া এবং হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্র করার আগাম শর্ত জুড়ে দিয়ে তিনি মূলত শান্তি চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে যাওয়া আটকে দিচ্ছেন।

নেতানিয়াহুর এই যুদ্ধবিরতি বিরোধী অবস্থানের পেছনে প্রথম এবং প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তার সরকারের কট্টর দক্ষিণপন্থী শরিকদের চাপ। বর্তমান জোট সরকার ইসরায়েলের ইতিহাসের সবচেয়ে উগ্রপন্থী সরকার হিসেবে পরিচিত, যেখানে ইতামার বেন-গভির এবং বেজালেল স্মোট্রিচের মতো মন্ত্রীরা যুদ্ধবিরতির ঘোর বিরোধী। তারা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি ঠেকানো এবং গাজা দখলের পক্ষে সোচ্চার রয়েছেন। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।

এমনকি ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজও গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনের ইঙ্গিত দিয়েছেন। নেতানিয়াহু জানেন যে, যুদ্ধবিরতি মেনে নিলে এই কট্টরপন্থীরা সমর্থন প্রত্যাহার করতে পারে, যা তার সরকারের পতন ঘটাবে। তাই নিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তিনি আদর্শিকভাবে বর্তমান সংঘাতময় পরিস্থিতি বজায় রাখতেই বেশি আগ্রহী।

দ্বিতীয়ত, গাজায় আন্তর্জাতিক বাহিনী মোতায়েনের বিষয়ে নেতানিয়াহুর তীব্র অনীহা কাজ করছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী গাজায় কোনো বিদেশি বা আঞ্চলিক শক্তিকে নিরাপত্তার দায়িত্ব দেওয়া হলে ইসরায়েলের সামরিক স্বাধীনতার পথ সংকুচিত হবে। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাৎজ।

ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গের মতে, আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতি মানেই হলো গাজা সংঘাতের আন্তর্জাতিকীকরণ, যা নেতানিয়াহুর কৌশলগত ও কূটনৈতিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। ইসরায়েলি বাহিনী বর্তমানে গাজায় যে ধরণের অভিযান পরিচালনা করছে, আন্তর্জাতিক বাহিনীর উপস্থিতিতে তা অসম্ভব হয়ে পড়বে। এর ফলে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব এবং একচ্ছত্র সামরিক আধিপত্য বজায় রাখার দাবিগুলো দুর্বল হয়ে পড়বে বলে তিনি আশঙ্কা করছেন।

তৃতীয় কারণটি হলো ফিলিস্তিন সংকটের দ্বিরাষ্ট্রীয় সমাধান চিরতরে ঠেকিয়ে দেওয়া। যদিও যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে সরাসরি ‘দ্বিরাষ্ট্রীয়’ শব্দ নেই, তবে সেখানে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের রাজনৈতিক আলোচনার সুযোগ রাখা হয়েছে। নেতানিয়াহু দীর্ঘ সময় ধরে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণার বিরোধিতা করে আসছেন এবং সম্প্রতি জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়াকে ‘উন্মাদনা’ বলে অভিহিত করেছেন। 

ইতিমধ্যে তার মন্ত্রীরা পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে নতুন ইহুদি বসতি গড়ার কাজ শুরু করেছেন, যা স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সম্ভাবনাকে কার্যত নস্যাৎ করার একটি সুপরিকল্পিত চেষ্টা। এই রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে গাজায় অস্থিতিশীলতা বজায় রাখা তার জন্য কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক। জর্জরিত গাজা সিটি।

সর্বশেষ এবং ব্যক্তিগত কারণ হিসেবে নেতানিয়াহুর নিজের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও আইনি লড়াইকে দেখা হচ্ছে। তার বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির মামলা চলছে এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের নিরাপত্তা ব্যর্থতার জন্য তাকে কঠোর জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে। সামনে নির্বাচনের বছর হওয়ায় এই চ্যালেঞ্জগুলো তার ক্ষমতা নড়বড়ে করে দিতে পারে। 

এই পরিস্থিতিতে নিজেকে ‘যুদ্ধকালীন নেতা’ হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি জাতীয় জরুরি অবস্থার দোহাই দিয়ে সমালোচনা আড়াল করতে পারছেন। ফলে হামাস, হিজবুল্লাহ বা ইরানের সঙ্গে সংঘাত জিইয়ে রাখা তার ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য ঢাল হিসেবে কাজ করছে।

ইত্তেফাক/টিএইচ