ইসরায়েল-সমর্থিত একটি ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠী সোমবার দাবি করেছে, তারা দক্ষিণ গাজা উপত্যকায় হামাস পুলিশের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে। এ ঘটনাকে হামাস ‘ইসরায়েলের সহযোগীদের’ কাজ বলে আখ্যা দিয়েছে।
হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস শহরে একটি চলন্ত গাড়ি থেকে গুলি চালিয়ে মাহমুদ আল-আস্তালকে হত্যা করা হয়। তিনি খান ইউনিসের অপরাধ তদন্ত পুলিশের প্রধান ছিলেন। বিবৃতিতে হামলাকারীদের ‘দখলদারদের সহযোগী’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।
হামাসবিরোধী একটি গোষ্ঠীর নেতা হুসাম আল-আস্তাল এ হত্যার দায় স্বীকার করেছেন। খান ইউনিসের পূর্বাঞ্চলে ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় অবস্থানরত ওই গোষ্ঠীর নেতা তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘যারা হামাসের সঙ্গে কাজ করবে, তাদের পরিণতি হবে মৃত্যু। মৃত্যু তোমাদের দিকে এগিয়ে আসছে।’ ভিডিওতে তাকে কালো সামরিক পোশাকে, হাতে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র নিয়ে দেখা যায়। উল্লেখ্য, আল-আস্তাল পদবিটি গাজার ওই অঞ্চলে বেশ প্রচলিত।
বার্তাসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, হামলার পরিস্থিতি তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। এক ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তা বলেছেন, ওই এলাকায় কোনো সামরিক অভিযানের বিষয়ে তারা অবগত নন।
যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজায় ছোট ও স্থানীয় পর্যায়ে হলেও হামাসবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীর আবির্ভাব ইসলামপন্থী এই সংগঠনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে। একই সঙ্গে বিভক্ত গাজাকে স্থিতিশীল ও ঐক্যবদ্ধ করার প্রচেষ্টাও আরও জটিল হয়ে উঠছে। এসব গোষ্ঠী ইসরায়েল-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সক্রিয় থাকায় স্থানীয় জনগণের মধ্যে তারা জনপ্রিয় নয়। যদিও তারা প্রকাশ্যে দাবি করে, তারা ইসরায়েলের নির্দেশে কাজ করে না। এর আগে হামাস যাদের ‘সহযোগী’ বলে অভিযুক্ত করেছে, তাদের প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ঘটনাও ঘটেছে।
গত অক্টোবর থেকে কার্যকর একটি যুদ্ধবিরতির আওতায় ইসরায়েল গাজা উপত্যকার প্রায় অর্ধেক এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করেছে। তবে বাকি অংশ এখনো তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যা মূলত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে—প্রায় সব ভবনই সেখানে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের অধিকাংশই এখন হামাস-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বসবাস করছে, বেশিরভাগই অস্থায়ী তাঁবু বা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে। হামাস সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুদ্ধের সময় বড় ক্ষয়ক্ষতি সত্ত্বেও সংগঠনটি এখনো হাজার হাজার যোদ্ধা নিয়ন্ত্রণে রাখছে।
ইসরায়েল তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীগুলোকে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প-এর গাজা পরিকল্পনার পরবর্তী ধাপগুলোতে ইসরায়েলের আরও সেনা প্রত্যাহার এবং আন্তর্জাতিকভাবে সমর্থিত প্রশাসনের কাছে হামাসের ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলা হলেও, এখন পর্যন্ত সে বিষয়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু জুন মাসে হামাসবিরোধী গোষ্ঠীগুলোকে ইসরায়েলের সমর্থনের কথা স্বীকার করেছিলেন, যদিও বিস্তারিত কিছু জানাননি।
গত তিন মাসে যুদ্ধবিরতির ফলে গাজায় বড় ধরনের সংঘর্ষ বন্ধ থাকলেও উভয় পক্ষই নিয়মিত লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছে। এই সময়ে অন্তত ৪৪০ জন ফিলিস্তিনি ও তিনজন ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সোমবার খান ইউনিসের মধ্যাঞ্চলে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন। তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী বলেছে, ওই ব্যক্তিরা ছিল সশস্ত্র যোদ্ধা, যারা সেনাদের দিকে এগিয়ে আসছিল। ‘হুমকি দূর করতেই’ তাদের হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজাভিত্তিক যোদ্ধারা ইসরায়েলে হামলা চালালে প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হন এবং আনুমানিক ২৫০ জনকে জিম্মি করা হয়—ইসরায়েলের হিসাবে। এর জবাবে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে গাজায় এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। এ যুদ্ধকে ঘিরে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ উঠলেও ইসরায়েল তা অস্বীকার করে আসছে।

