কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত না হয়েও কারাগারের ভেতরে মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন যুক্তরাজ্যে আটক তিন ফিলিস্তিনপন্থী তরুণ কর্মী। মাসের পর মাস ধরে চলা অনশনের শেষ দিনগুলোতে তাদের শরীর ভেঙে পড়ছিল দ্রুত, তবু প্রতিবাদ থামাতে রাজি ছিলেন না।
৭৩ দিন অনশন করা ৩১ বছর বয়সী হেবা মুরাইসির ওজন নেমে আসে ৪৯ কেজিতে। অসহ্য ব্যথায় বসে থাকাও তার জন্য কষ্টকর হয়ে ওঠে। চিকিৎসকদের আশঙ্কা ছিল, তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে শুরু করেছে। স্মৃতিভ্রংশ, পেশিতে খিঁচুনি- সব মিলিয়ে স্থায়ী স্নায়বিক ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়।
একইভাবে ৬৫ দিন অনশন করা কামরান আহমেদ এবং ৪৬ দিন অনেশনে থাকা টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত লিউই কিয়ারামেলো জানতেন, তার শরীর আর সইছে না। তবু গত বুধবার স্বাস্থ্য পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতির পর তারা অনশন ভাঙার ঘোষণা দেন।
‘শুনানি হচ্ছিল বলেই অনশন চালিয়ে যেতে চেয়েছিলাম’
লন্ডনে ফুলের দোকান ও লাইফগার্ড হিসেবে কাজ করা হেবা মুরাইসি আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি শেষ পর্যন্ত যেতে রাজি ছিলাম, কারণ মনে হচ্ছিল- অবশেষে কেউ আমাদের কথা শুনছে।’
কামরান আহমেদের বলেন, অনশন ভাঙার সিদ্ধান্ত ছিল মিশ্র অনুভূতির। আমি শেষ পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত ছিলাম। কিন্তু আমার প্রিয়জনেরা আর আমাকে এক পা এগোতে দেখতে চাননি।’
এই অনশনে অংশ নিয়েছিলেন মোট আটজন। এখনো একজন উমর খালিদ অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি মাংসপেশির জটিল রোগে আক্রান্ত।
শরীর ভাঙছে, শঙ্কা স্থায়ী ক্ষতির
কামরান আহমেদের শরীরের ওজন ২৫ শতাংশ কমে গেছে। হৃদ্পেশি সঙ্কুচিত হয়েছে, বুকব্যথা বাড়ছে, এক কানে শুনতে পাচ্ছেন না। কথা জড়িয়ে যাচ্ছে, হাঁটলেই শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। অনশন শুরুর পর তাকে সাতবার হাসপাতালে নিতে হয়েছে।
চিকিৎসক ও পরিবারের সদস্যদের আশঙ্কা- দীর্ঘ অনাহারে যে ক্ষতি হয়েছে, তার প্রভাব হয়তো বছরের পর বছর পরে প্রকাশ পাবে। অনশন ভাঙার পর পুনরায় খাবার গ্রহণও ঝুঁকিপূর্ণ, ভুল ব্যবস্থাপনায় তা প্রাণঘাতী হতে পারে।
অভিযোগ অস্বীকার, দীর্ঘ আটক
এই বন্দিরা ‘ফিলটন ২৪’ নামে পরিচিত একটি গোষ্ঠীর অংশ। তাদের বিরুদ্ধে ব্রিস্টলে ইসরায়েলের অস্ত্র প্রস্তুতকারক এলবিট সিস্টেমসের যুক্তরাজ্য শাখায় এবং অক্সফোর্ডশায়ারের একটি আরএএফ ঘাঁটিতে ভাঙচুরের অভিযোগ আনা হয়েছে। তারা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
তবু প্রত্যেকেই বিচার শুরুর আগেই এক বছরের বেশি সময় কারাগারে কাটাবেন- যা যুক্তরাজ্যের সাধারণ ছয় মাসের প্রি-ট্রায়াল সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
দাবি আদায় হয়েছে কি?
অনশনকারীদের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে ছিল- তাৎক্ষণিক জামিন, ন্যায্য বিচার নিশ্চিত করা, প্যালেস্টাইন অ্যাকশন সংগঠনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং কারাগারে সেন্সরশিপ বন্ধ।
সরকার বলেছে, বিচার হবে ন্যায্য, জামিন আদালতের বিষয়, আর বন্দিদের কল্যাণনীতি মানা হচ্ছে। তবে অনশন ভাঙার পর সরকার আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
এর মধ্যেই একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে- হেবা মুরাইসিকে তার বাড়ির কাছের ব্রনজফিল্ড কারাগারে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত।
প্রতীকী জয়, নাকি নৈতিক চাপ?
সমর্থকদের দাবি, অনশন আন্দোলনের চাপে সরকার এলবিট সিস্টেমসকে ২০০ কোটি পাউন্ডের একটি সামরিক প্রশিক্ষণ চুক্তি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে- যদিও সেই কাজ যাচ্ছে আরেক মার্কিন অস্ত্র কোম্পানির কাছে।
লেবার পার্টির এমপি জন ম্যাকডোনেল বলেন, ‘সরকার কিছুটা হলেও ছাড় দিতে বাধ্য হয়েছে।’
পরিবারের ভাষায়, এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় অর্জন- ইসরায়েলি অস্ত্র ব্যবসা ও যুক্তরাজ্যে প্রি-ট্রায়াল আটকের অপব্যবহার নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি। তারা নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনশন ভাঙার পর কামরান আহমেদের প্রথম চাওয়া ছিল- এক কাপ চা, সঙ্গে সয়া দুধ।
তার বোন শাহমিনা আলম বলেন,‘সরকার ঠিক করে দিতে পারে না- ওরা বাঁচবে কি-না। শেষ পর্যন্ত নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার ওরা নিজেরাই ফিরিয়ে নিয়েছে।’
কারাগারের দেয়ালের ভেতর এই অনশন হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু ব্রিটেনে ফিলিস্তিনপন্থী প্রতিবাদ রাজনীতিতে এটি একটি গভীর ছাপ রেখে গেছে, যেখানে শরীরই হয়ে উঠেছিল শেষ অস্ত্র।
