ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গে নিত্যযুদ্ধ, ধু-ধু বালুচরে বন্দি ফুলছড়ির জীবন

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২৬, ১৬:০১

ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে যুদ্ধ করেই বেঁচে আছে ফুলছড়ির মানুষ। কখনো ভাঙন, কখনো বন্যা—আর এখন নাব্যসংকট। নদটি এখন আর স্রোতস্বিনী নয়; বিস্তীর্ণ বালুচরে রূপ নেওয়া মৃতপ্রায় জলধারা। নদীর বুক জুড়ে জেগে উঠেছে ধু-ধু বালুর চর। হারিয়ে গেছে স্বাভাবিক প্রবাহ।

গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার আয়তনের প্রায় ৯৫ শতাংশই চরাঞ্চল। ফলে উপজেলার মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষকে বসবাস করতে হয় চরে। যেখানে নেই আধুনিকতার ছোঁয়া, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা। নাব্য হারানো ব্রহ্মপুত্র এসব মানুষের জীবনে আশীর্বাদ নয়, বরং প্রতিদিনের দুঃসহ সংগ্রামের নাম।

একসময় এরেন্ডাবাড়ী, ফজলুপুর ও ফুলছড়ি ইউনিয়নের চরাঞ্চলে নৌকাই ছিল জীবন ও জীবিকার প্রধান ভরসা। আজ সেই নৌপথ কার্যত অচল। নদীতে পানি নেই, আছে শুধু বালু আর বিচ্ছিন্ন জলাধার। ফলে প্রতিদিন চরবাসী মানুষকে ৮-১০ কিলোমিটার পথ তপ্ত বালু মাড়িয়ে হেঁটে মূল ভূখণ্ডে যেতে হচ্ছে। কোথাও হাঁটুসমান কাদা-পানি, কোথাও বুকসমান বালু—এই পথ পাড়ি দিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে নারী, শিশু ও বৃদ্ধরা।

চরাঞ্চলের ধান, ভুট্টা, পাট ও সবজি একসময় জেলার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। কিন্তু নাব্যসংকটে উৎপাদিত ফসল বাজারে নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। পরিবহন ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় লাভের বদলে লোকসান গুনছেন কৃষকরা। অনেকেই চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন, বাড়ছে দারিদ্র্য। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ না থাকায় দেশি মাছের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। একসময় যারা ব্রহ্মপুত্রের বুকে জাল ফেলে জীবিকা নির্বাহ করতেন, সেই শত শত জেলে পরিবার আজ কর্মহীন। নদী আছে, কিন্তু মাছ নেই—জীবন আছে, কিন্তু জীবিকা নেই।

শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিদিনের স্কুলযাত্রা যেন একেকটি যুদ্ধ। বালুচর পাড়ি দিয়ে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে গিয়ে নিয়মিত ক্লাসে যেতে পারছে না অনেক শিক্ষার্থী। ঝরে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে। অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে যেন ছুটছে চরশিশুদের জীবন। চিকিৎসায় জীবন-মৃত্যুর দৌড় চরাঞ্চলে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবার কোনো ব্যবস্থা নেই। মুমূর্ষু রোগী কিংবা প্রসূতি মাকে উপজেলা সদরে নিতে যাতায়াতেই কেটে যাচ্ছে মূল্যবান সময়। দ্রুত পরিবহনের অভাবে পথেই মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।

নদীর প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাচ্ছে। পরিবেশবিদরা আশঙ্কা করছেন, এভাবে চলতে থাকলে পুরো অঞ্চল মরুকরণের দিকে এগিয়ে যাবে। স্থানীয়দের একটাই দাবি-বিচ্ছিন্ন ড্রেজিং নয়, পরিকল্পিত ও স্থায়ী নদীখনন। তবেই বাঁচবে ব্রহ্মপুত্র, বাঁচবে ফুলছড়ির চরবাসী মানুষ। গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম বলেন, উজানে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং অতিরিক্ত পলি জমার কারণে ব্রহ্মপুত্রে নাব্যসংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। মাঝে মধ্যে ড্রেজিং করা হলেও পুরো নদ জুড়ে স্থায়ী সমাধান দেওয়া ব্যয়বহুল ও চ্যালেঞ্জিং।

ইত্তেফাক/এসএএস