২০২৫ সাল জুড়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি ঘটনার ভেতরে ৭১টি ঘটনায় ‘সাম্প্রদায়িক উপাদান’ পেয়েছে পুলিশ। এসব তথ্য যাচাইকৃত ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর), জেনারেল ডায়েরি (জিডি), চার্জশিট এবং সারা দেশের তদন্ত অগ্রগতির ভিত্তিতে পাওয়া গেছে এবং এসব ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং।
পুলিশের বরাতে প্রেস উইং জানিয়েছে, পর্যালোচনায় মোট ৭১টি ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়া গেছে। আর ৫৭৪টি ঘটনা সাম্প্রদায়িক নয় বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সাম্প্রদায়িক ঘটনাগুলোর মধ্যে প্রধানত ধর্মীয় উপাসনালয় ও প্রতিমা ভাঙচুর বা অবমাননার ঘটনা ছিল, পাশাপাশি অল্পসংখ্যক অন্যান্য অপরাধও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
বাকি ৫৭৪টি ঘটনা ধর্মের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে উদ্ভূত—যার মধ্যে প্রতিবেশীর সঙ্গে বিরোধ, জমিসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চুরি, যৌন সহিংসতা এবং পূর্ববর্তী ব্যক্তিগত শত্রুতাজনিত ঘটনাও রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক উপাদান রয়েছে এমন ঘটনা মোট ৭১টি। যার মধ্যে মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ৩৮, মন্দিরে চুরি ১ ও একজনকে হত্যা।
এ ছাড়া আটটি মন্দিরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। সাম্প্রদায়িক উপাদান আছে এমন অন্যান্য ঘটনা ২৩টি। যার মধ্যে প্রতিমা ভাঙার হুমকি, ফেসবুক পোস্ট, উপাসনালয়ের আঙ্গিনায় ক্ষতি ইত্যাদি রয়েছে।
সাম্প্রদায়িক উপাদান মিলেছে এমন ঘটনায় ৫০টি মামলা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ ছাড়া অন্যান্য পুলিশি ব্যবস্থা ২১টি।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য সংশ্লিষ্ট মোট ৬৪৫টি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। যার মধ্যে ৫৭৪ ঘটনায় সাম্প্রদায়িক উপাদান নেই। এর মধ্যে প্রতিবেশী বিরোধের ঘটনা ৫১, জমি সংক্রান্ত বিরোধ ২৩টি, চুরির ঘটনা ১০৬টি, পূর্বশত্রুতা ২৬টি ঘটনা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া অস্বাভাবিক মৃত্যু রয়েছে ১৭২। তবে এসব ঘটনার মধ্যে ৫৮টি ধর্ষণের ঘটনা পাওয়া গেছে পুলিশের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। অন্যান্য ঘটনা ১৩৮টি।
সাম্প্রদায়িক উপাদান পাওয়া যায়নি এমন ঘটনাগুলোর মধ্যে ৩৯০ মামলা দায়ের ও ইউডি মামলা ১৫৪টি। এসব মামলায় ৪৯৮ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। অন্যান্য পুলিশি ব্যবস্থা রয়েছে ৩০টি। অন্যান্যের মধ্যে রয়েছে: অপহরণ, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চাঁদাবাজি ইত্যাদি।
প্রেস উইং জানিয়েছে, সব ধরনের অপরাধই গুরুতর এবং জবাবদিহিতা দাবি করে; তবে উপাত্ত থেকে এটি স্পষ্ট যে সংখ্যালঘু ভুক্তভোগীদের অধিকাংশ ঘটনাই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে থাকা বিস্তৃত অপরাধমূলক ও অন্যান্য সামাজিক কারণ থেকে উদ্ভূত। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক শ্রেণিবিন্যাস ভ্রান্ত তথ্য প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং আরও কার্যকর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণে ভূমিকা রাখে।
প্রেস উইং জানায়, জাতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ এখনো গুরুতর আইন-শৃঙ্খলা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রতিবছর সারা দেশে সহিংস অপরাধে গড়ে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে—যা কোনোভাবেই গর্ব করার মতো বিষয় নয়। প্রতিটি প্রাণহানি একটি ট্র্যাজেডি এবং এমন পরিসংখ্যানের মুখে কোনো সমাজেরই আত্মতুষ্টিতে ভোগা উচিত নয়। তবে একই সঙ্গে, এই পরিসংখ্যানকে প্রাসঙ্গিক প্রেক্ষাপটে বুঝতে হবে। সহিংস অপরাধ ধর্ম, জাতিগত পরিচয় ও ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে সব সম্প্রদায়কেই প্রভাবিত করে।
বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান এবং অন্যান্য বিশ্বাসের মানুষের দেশ—যেখানে সব নাগরিকের সমান অধিকার রয়েছে। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা শুধু আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্বই নয়, বরং একটি নৈতিক কর্তব্য। উপাসনালয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, উসকানি প্রতিরোধ করা, অপরাধমূলক ঘটনার ক্ষেত্রে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া এবং গুজব থেকে সত্যকে আলাদা করা সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য অত্যাবশ্যক বলে জানিয়েছে প্রেস উইং।
