গাজায় একদিকে ইসরায়েলি হামলা অন্যদিকে অজানা ভাইরাসের আতঙ্ক

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২১

ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘ দুই বছরের সামরিক অভিযানে বিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় এখন নতুন এক মরণব্যাধি হিসেবে দেখা দিয়েছে রহস্যময় ও রূপান্তরিত (মিউটেড) এক ভাইরাস। গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও ইসরায়েলি অবরোধের কারণে ত্রাণ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় গাজার স্বাস্থ্যব্যবস্থা বর্তমানে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে। 

তীব্র অনাহার এবং অপুষ্টির ফলে সাধারণ মানুষের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এতটাই কমে গেছে যে, সাধারণ সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হয়েও অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছেন। সম্প্রতি ৮ বছর বয়সী শিশু মরিয়ম কালুবের মৃত্যু এই ভয়াবহ সংকটের চিত্র আরও স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। মরিয়মের খালা ইমান কালুব ‘মিডলইস্ট আই’কে জানান, দুই বছরের ভয়াবহ বোমাবর্ষণ থেকে বেঁচে ফেরা শিশুটি শেষ পর্যন্ত একটি সাধারণ ভাইরাসের কাছে হার মানল।

গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, কয়েক সপ্তাহ ধরে এই সংক্রামিত ভাইরাসটি পুরো উপত্যকাজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পরীক্ষার সীমিত সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জামের তীব্র ঘাটতির কারণে চিকিৎসকেরা এখনো ভাইরাসটির প্রকৃত ধরণ শনাক্ত করতে পারেননি। 

আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া জানিয়েছেন, গাজার এমন কোনো ঘর খুঁজে পাওয়া দুষ্কর যেখানে অন্তত একজন এই রোগে আক্রান্ত হননি। তার ধারণা, এটি ইনফ্লুয়েঞ্জার কোনো রূপান্তরিত ধরন বা এমনকি কোভিড-১৯ এর নতুন কোনো রূপ হতে পারে। বর্তমানে গাজার হাসপাতালগুলোতে জরুরি রোগী ভর্তির হার ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যাদের অধিকাংশেরই ফুসফুসে সংক্রমণ, প্রচণ্ড জ্বর এবং শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

গাজার স্বাস্থ্য অবকাঠামো ইসরায়েলি হামলায় বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসাসেবা প্রদান করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, রানতিসি হাসপাতালটি একসময় ক্যানসার ও কিডনি রোগের চিকিৎসার প্রধান কেন্দ্র থাকলেও এখন সেখানে কেবল সংক্রামক ব্যাধির চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজার ৫৫ শতাংশ জরুরি ওষুধের সরবরাহ নেই এবং ৭১ শতাংশ মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জামের মজুত শূন্য হয়ে গেছে। ওষুধের অভাবে চিকিৎসকেরা অনেক সময় মুমূর্ষু রোগীদের কেবল অক্সিজেন ছাড়া আর কোনো সহায়তা দিতে পারছেন না। অপুষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী অনাহারের কারণে শিশু, বৃদ্ধ এবং অন্তঃসত্ত্বা নারীরা এই সংক্রমণের সবচেয়ে বেশি শিকার হচ্ছেন।

জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি চললেও গাজার ৭৭ শতাংশ মানুষ এখনো তীব্র খাদ্যসংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়শিবিরে অতিরিক্ত ভিড়, দূষিত পানি এবং হাড়কাঁপানো শীত এই ভাইরাস ছড়ানোর প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে। 

স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, সাধারণ সময়ে যেসব মৃত্যু অনায়াসেই ঠেকানো যেত, প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে এখন অসহায়ভাবে সেই সব মৃত্যু দেখতে হচ্ছে তাদের। গাজার বর্তমান পরিস্থিতিকে চিকিৎসকেরা একটি ‘নজিরবিহীন মানবিক ও স্বাস্থ্যসংকট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

সূত্র: মিডলইস্ট আই

ইত্তেফাক/টিএইচ