সুইজারল্যান্ডের দাভোসে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) বার্ষিক সম্মেলনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের পাশাপাশি সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনিরের অংশগ্রহণ পাকিস্তানের শাসনব্যবস্থায় এক নতুন ও বিরল অধ্যায়ের সূচনা করেছে।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের এই উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দলটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান আল সৌদ এবং আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে মিলিত হয়েছেন।
সাধারণত বিশ্বজুড়ে এই সম্মেলনটি বেসামরিক রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক নেতাদের কেন্দ্রস্থল হলেও, একজন দায়িত্বরত সেনাপ্রধানের উপস্থিতি পাকিস্তানকে এক ব্যতিক্রমী ও উন্মুক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। ডব্লিউইএফ মূলত একটি বেসামরিক নেতৃত্বাধীন প্ল্যাটফর্ম হওয়ায় কোনো প্রধান গণতান্ত্রিক দেশ তাদের বর্তমান সামরিক প্রধানকে এই মঞ্চে নিয়ে আসেনি, যা আন্তর্জাতিক মহলে পাকিস্তানের সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
পাকিস্তানের সরকারি ভাষ্যমতে, দেশটিতে বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রদর্শনের লক্ষ্যেই এই যৌথ অংশগ্রহণ। বিশেষ করে স্পেশাল ইনভেস্টমেন্ট ফ্যাসিলিটেশন কাউন্সিল (এসআইএফসি) গঠনের মাধ্যমে খনিজ, জ্বালানি, কৃষি ও প্রযুক্তি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ দ্রুততর করতে সেনাবাহিনী এখন সরাসরি অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে অংশ নিচ্ছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানের এই সহাবস্থান বিশ্ববাসীর কাছে এই বার্তাই পৌঁছে দিয়েছে, পাকিস্তানে বেসামরিক নেতৃত্ব এখনো এককভাবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করার মতো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
দাভোসের মতো জায়গায় যেখানে নীতিমালার পাশাপাশি প্রতীকী উপস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সেখানে পাকিস্তানের এই পদক্ষেপকে শক্তিমত্তা নয় বরং ‘তত্ত্বাবধান’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্বমঞ্চে পাকিস্তান একটি আত্মবিশ্বাসী গণতন্ত্র হিসেবে উপস্থিত হওয়ার বদলে এমন এক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে, যারা নিজের প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত কর্তৃত্ব নিয়ে নিজেরাই দ্বিধান্বিত।
ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তানের সামরিক প্রধানরা অবসরের পর অথবা রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে থাকাকালীন দাভোসে বক্তব্য রাখলেও, দায়িত্বরত অবস্থায় এমন অংশগ্রহণ নজিরবিহীন। এর আগে ২০১৭ সালে সাবেক সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ দাভোসে ভাষণ দিয়েছিলেন কেবল অবসরের পর।
বর্তমান পরিস্থিতিতে পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে এই বিশেষ সফরের কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না মেলায় আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নানা নেতিবাচক ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচিত নেতাদের বৈধতা বা দক্ষতার প্রমাণের জন্য ইউনিফর্ম পরিহিত কোনো কর্মকর্তার উপস্থিতির প্রয়োজন হয় না। যখনই এই ধরনের ভারসাম্যহীন চিত্র ফুটে ওঠে, তখন সেটি আর অংশীদারিত্ব থাকে না, বরং তা বিশ্বমঞ্চে উপহাসের খোরাক জোগায়।
বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ও বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সফরটি পাকিস্তানের জন্য কোনো বিশাল অর্থনৈতিক অর্জন বয়ে আনার বদলে দেশটির বেসামরিক ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকেই বৈশ্বিক প্রচারণার আলোয় নিয়ে এসেছে।
পাকিস্তান আইনত তাদের গণতন্ত্র অটুট থাকার দাবি করলেও দাভোসের এই পারফরম্যান্স বিশ্ববাসীর কাছে এক রূঢ় সত্য তুলে ধরেছে—যেখানে ক্ষমতার প্রকৃত উৎস সংবিধান নয়, বরং অন্য কোথাও নিহিত। এই ঘটনাটি পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তিকে বিদেশের মাটিতে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং দেশটিকে সমপর্যায়ের বন্ধুরাষ্ট্রের বদলে একটি বিশেষ পর্যবেক্ষণমূলক রাষ্ট্রে পরিণত করেছে।
সূত্র: নিউজ গ্লোব অফিসিয়াল ও আরব নিউজ

