শীতকাল মানেই অনেক ফলের অফ-সিজন। কিন্তু রাঙামাটির পাহাড়ি জনপদে এ সময়টাতেই জমে উঠেছে এক বিশেষ ফলের বাণিজ্য- হানিকুইন জাতের আনারস। মৌসুমের বাইরে হয়েও বাজারে পাকা, রসালো আর মিষ্টি আনারসের এমন সরবরাহ স্থানীয় অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ জুগিয়েছে। পাহাড়ি হাট-বাজার থেকে দেশের বড় শহর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে এই আনারসের সুনাম।
ভোরের আলো ফোটার আগেই শুরু হয় ব্যস্ততা। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে চাষিরা ইঞ্জিনচালিত নৌকায় করে কাপ্তাই হ্রদ পাড়ি দিয়ে রাঙামাটি শহরের ভাসমান হাটগুলোতে নিয়ে আসেন তাদের উৎপাদিত আনারস। বনরূপার সমতাঘাট, পুরাতন বাসস্টেশন ঘাটসহ কয়েকটি পয়েন্টে সকালেই বসে ফলের অস্থায়ী বাজার। নৌকা থেকে ঝুড়ি ঝুড়ি আনারস নামানো, দরদাম, বাছাই- সব মিলিয়ে এক প্রাণচঞ্চল দৃশ্য।
এখান থেকেই পাইকাররা বড় আকারে আনারস কিনে ট্রাকে তুলে পাঠিয়ে দেন চট্টগ্রাম, ঢাকা ও দেশের অন্যান্য জেলায়। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও পাইকারি দামে কিনে খুচরা বাজারে সরবরাহ করছেন। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, বর্তমানে এই হানিকুইন আনারসের বাণিজ্য কয়েক কোটি টাকার সীমা ছাড়িয়েছে।
কৃষি বিভাগ জানায়, ‘হানিকুইন’ আনারস একটি উন্নত ও উচ্চ ফলনশীল জাত, যা বাংলাদেশে ২০০৫ সাল থেকে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। ফলটি আকারে তুলনামূলক ছোট হলেও অত্যন্ত মিষ্টি এবং ভেতরের শাঁস গাঢ় হলুদ বর্ণের। বিশেষ ব্যবস্থাপনা ও হরমোন প্রয়োগের মাধ্যমে বছরের প্রায় সব সময়ই ফলন পাওয়া সম্ভব। ফলে ঐতিহ্যগত মৌসুমের বাইরে শীতকালেও বাজারে এই আনারসের সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে।
রাঙামাটি জেলার মধ্যে নানিয়ারচর উপজেলায় এ আনারসের চাষ সবচেয়ে বেশি। পাহাড়ি দোঁআশ মাটি ও ঢালু জমি এ জাতের জন্য উপযোগী হওয়ায় সেখানে বাম্পার ফলন হচ্ছে। এছাড়া রাঙামাটি সদর, লংগদু ও বাঘাইছড়ি উপজেলাতেও ব্যাপক চাষ হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, শহরের বিভিন্ন ঘাট ও হাটে প্রতিটি আনারস ২০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শীতের সকালে হাট প্রাঙ্গণ যেন হয়ে ওঠে এক মিলনমেলা- চাষি, পাইকার, খুচরা বিক্রেতা ও ক্রেতাদের কোলাহলে মুখর চারপাশ।
পাইকারি ব্যবসায়ী জামাল হোসেন বলেন, চাষিদের কাছ থেকে প্রতিটি আনারস ২০ থেকে ২২ টাকায় কিনে বড় শহরগুলোতে সরবরাহ করা হয়। এবার ফলন ভালো, আকারও বড়। ফলে চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকায় বেশি দিন মজুদ রাখা যায় না- এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা।
চাষিরাও বলছেন, এই আনারস তাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। নানিয়ারচরের কৃষক পুতুল চাকমা জানান, ধান বা অন্য ফসলের তুলনায় হানিকুইন আনারস অনেক বেশি লাভজনক। এক হেক্টরে এক হাজার থেকে দেড় হাজার আনারস পাওয়া যায়। খরচ বাদ দিয়ে এক একর জমি থেকে শীতকালেও প্রায় এক লাখ টাকা আয় হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাঙামাটি জেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরে জেলায় আনারস চাষের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ২ হাজার ৫৫০ হেক্টর। গত অর্থবছরে আনারস চাষ হয়েছে ২ হাজার ৫৩৭ হেক্টর জমিতে। সাধারণত এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত মৌসুম থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে নভেম্বর-ডিসেম্বর থেকেই আগাম ফল বাজারে আসছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, পাহাড়ের অনেক পতিত জমিতে আনারস চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। হানিকুইন জাতটি দেশের সবচেয়ে মিষ্টি আনারসগুলোর একটি। আগাম চাষের কারণে কৃষকরা বাড়তি লাভ পাচ্ছেন। তবে তিনি সংরক্ষণাগার বা কোল্ড স্টোরেজের অভাবকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, সঠিক সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প গড়ে উঠলে কৃষকের আয় আরও বাড়ানো সম্ভব।
রাঙামাটির পাহাড়ি জনপদে এখন আনারস শুধু ফল নয়, অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। শীতের কুয়াশা ভেদ করে ভাসমান হাটে নৌকা ভেড়ানো চাষিদের চোখে তাই ক্লান্তির চেয়ে বেশি থাকে আশার আলো। মৌসুমের বাইরে ফলন, কম খরচে উৎপাদন আর ভালো বাজারদর- সব মিলিয়ে ‘হানিকুইন’ এখন পাহাড়ের নতুন সোনালি ফসল।
