মানবসমাজে বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নহে, বরং ন্যায়প্রতিষ্ঠা ও অপরাধ হ্রাস করা। সভ্যতার অগ্রগতির পাশাপাশি বিশ্ব উপলব্ধি করিয়াছে-শাস্তি যদি কেবল ভয় প্রদর্শনের উপায় হয়, তাহা হইলে তাহা সাময়িক নিয়ন্ত্রণ আনিতে পারে; কিন্তু প্রকৃত সংশোধন ঘটায় না। এই কারণেই আধুনিক যুগে কারাগারকে ‘সংশোধনাগার’ বলা হয়; কিন্তু বাস্তবতা দেখিলে প্রশ্ন জাগে-আমাদের সমাজে কি সত্যিই অপরাধীরা সংশোধিত হয়? নাকি বিচারব্যবস্থার ফাঁকফোকর ও সামাজিক ব্যর্থতা মিলাইয়া অপরাধকে পুনরায় জন্ম দেয়? ইত্তেফাকে প্রকাশিত বগুড়ার সাম্প্রতিক একটি মর্মান্তিক ঘটনা এই প্রশ্নগুলিকেই উসকাইয়া দেয়। বগুড়ায় বোনকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় এক তরুণের প্রাণহানি ঘটে। সংবাদে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি পূর্বেও ছুরিকাঘাতের ঘটনায় গ্রেপ্তার হইয়াছিল এবং পরে জামিনে মুক্ত হইয়া পুনরায় সহিংস অপরাধে জড়াইয়া পড়ে।
জামিন বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আইনের চোখে অভিযুক্ত ব্যক্তি অপরাধী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্দোষ-এই নীতি সভ্যসমাজের অন্যতম ভিত্তি; কিন্তু যখন দেখা যায়, জামিনে মুক্ত ব্যক্তি পুনরায় গুরুতর অপরাধ করিবার সাহস পায়, তখন প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক-আমাদের ব্যবস্থায় কোথায় গলদ রহিয়াছে? সমাজের ভিতরেই কি এমন একটি সংস্কৃতি জন্ম লইয়াছে, যাহা অপরাধীকে নির্ভীক করিয়া তোলে? প্রথমত, আমাদের বিচারপ্রক্রিয়ার ধীরগতি একটি বড় সমস্যা। মামলা বৎসরের পর বৎসর চলিতে থাকিলে অভিযুক্ত ব্যক্তি বাস্তবে শাস্তির ভয় অনুভব করে না। দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীর মনে এই ধারণা জন্মায়-আইনের হাত হয়তো দীর্ঘ; কিন্তু তাহা ধীর এবং কখনো কখনো দুর্বল। ফলে জামিন পাওয়া মানেই অনেক সময় একপ্রকার মুক্তির অনুভূতি, যাহা পুনরায় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায়। দ্বিতীয়ত, সংশোধনাগারের ধারণাটি বাস্তবে কতখানি কার্যকর, তাহাও বিবেচনার দাবি রাখে। কারাগারে বন্দিদের মানসিক পুনর্বাসন, আচরণগত পরিবর্তন বা সামাজিক পুনর্গঠনের যে কাঠামো থাকা প্রয়োজন, তাহা কতখানি বাস্তবায়িত হইতেছে? যদি কারাগার কেবল বন্দিত্বের স্থান হয়; কিন্তু সংশোধনের পরিবেশ সৃষ্টি না করে, তাহা হইলে ব্যক্তি বাহিরে আসিয়া পুনরায় পূর্বের আচরণে ফিরিয়া যাওয়া অস্বাভাবিক নহে। আধুনিক দৃষ্টিতে অপরাধ দমন মানে শুধু শাস্তি প্রদান নহে, বরং অপরাধীর মানসিকতা পরিবর্তনের প্রচেষ্টা।
তৃতীয়ত, সামাজিক সংস্কৃতির প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। নারীর প্রতি উত্ত্যক্ততা বা হয়রানিকে অনেক সময় সমাজে তুচ্ছ ঘটনা হিসাবে দেখা হয়। এই অবহেলা অপরাধীদের সাহস জোগায়। যখন কোনো ব্যক্তি প্রতিরোধ করে, তখন প্রতিশোধপরায়ণতা জন্ম নেয়। ফলে ব্যক্তিগত বিরোধ ক্রমে সহিংসতায় রূপ নেয়। সমাজ যদি প্রাথমিক পর্যায়ে অন্যায়কে গুরুত্বসহকারে প্রতিহত না করে, তাহা হইলে আইন প্রয়োগের সময় পর্যন্ত পরিস্থিতি অনেক দূর গড়াইয়া যায়। চতুর্থত, জামিনের পর পর্যবেক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা বড় প্রশ্ন। উন্নত অনেক দেশে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অভিযুক্তদের উপর নজরদারি, নিয়মিত রিপোর্টিং বা আচরণগত মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকে। আমাদের দেশের বাস্তবতায় ইহা এখনো দূর অন্ত।
অতএব, প্রয়োজন সমন্বিত সংস্কার। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা, জামিন প্রদানের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বিশ্লেষণ জোরদার করা, কারাগারকে প্রকৃত অর্থে সংশোধনাগারে রূপান্তর করা এবং সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়িয়া তোলা-এই চারটি স্তম্ভ ছাড়া পরিবর্তন সম্ভব নহে। পাশাপাশি ভুক্তভোগী পরিবারকে সুরক্ষা প্রদান এবং পুনরায় সহিংসতার আশঙ্কা থাকিলে কঠোর নজরদারি জরুরি। যদি মানুষ অনুভব করে যে, অভিযোগ করিয়াও নিরাপত্তা নিশ্চিত নহে, তাহা হইলে ন্যায়বিচারের ধারণাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। বিচারব্যবস্থার প্রকৃত শক্তি তাহার কঠোরতায় নহে, বরং ন্যায়সংগত ও কার্যকর সংশোধনে। সুতরাং, সময় আসিয়াছে আত্মসমালোচনার-আমরা কি শাস্তি দিতেছি, নাকি সত্যিই মানুষকে সংশোধনের পথ দেখাইতেছি? যদি উত্তরটি স্পষ্ট না হয়, তাহা হইলে ভবিষ্যতে আরও অনেক ফাহিমের গল্প আমাদের শুনিতে হইবে-যাহা একটি সভ্যসমাজের জন্য লজ্জার বিষয়।
