‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়িটির তীরে—এই বাংলায়’—এই অমর পঙ্ক্তির স্রষ্টা জীবনানন্দ দাশ-এর আজ ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। বাংলার প্রকৃতি, নিঃসঙ্গতা আর সময়চেতনার অনন্য রূপ তিনি কবিতায় এমনভাবে ধারণ করেছেন, যা তাকে দিয়েছে “রূপসী বাংলার কবি”র স্বীকৃতি।
১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন আধুনিক বাংলা কবিতার এই প্রধান কবি। জন্মদিন উপলক্ষে তার জন্মশহর বরিশালে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সংগঠনের উদ্যোগে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা, আবৃত্তি ও চিত্রপ্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে।
সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সকাল ১০টায় বরিশাল বজ্রমোহন কলেজের জীবনানন্দ চত্বরে ‘উত্তরণ’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে ‘স্মরণে জীবনানন্দ’ শীর্ষক মূল অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কবিকে ঘিরে বরিশালের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বইছে উৎসবের আমেজ।
জীবনানন্দ দাশ তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত বরিশাল শহরের এক শিক্ষিত বৈদ্য পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শহরের বগুড়া রোডের (বর্তমান জীবনানন্দ দাশ সড়ক) বাড়িতেই তার বেড়ে ওঠা। বাবা সত্যানন্দ দাশ ছিলেন শিক্ষক, মা কুসুমকুমারী দাশ ছিলেন কবি—মায়ের কাছ থেকেই সাহিত্যচর্চার প্রথম প্রেরণা পান তিনি। কর্মজীবনে তিনিও বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বরিশালের প্রকৃতি তার কাব্যভুবনের প্রধান প্রেরণাসূত্র হয়ে ওঠে।
কবিতায় তার বিচরণ ছিল গভীর ও বৈচিত্র্যময়। প্রায় ৮০০ কবিতা রচনা করলেও জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয় মাত্র ২৬২টি। বিভিন্ন সাময়িকীতে তার কবিতা প্রকাশিত হতে থাকে। তার উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে— বনলতা সেন, ঝরা পালক, ধূসর পাণ্ডুলিপি, মহাপৃথিবী, সাতটি তারার তিমির, রূপসী বাংলা ও বেলা অবেলা কালবেলা। এছাড়া তার গদ্যগ্রন্থ কবিতার কথা এবং মৃত্যুর পর প্রকাশিত উপন্যাস মাল্যবান ও সতীর্থ বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।
১৯৫২ সালে ‘সিগনেট সংস্করণ’ বনলতা সেন বাংলা ১৩৫৯ সালের শ্রেষ্ঠ কাব্যগ্রন্থ হিসেবে পুরস্কৃত হয়। মৃত্যুর পর ১৯৫৫ সালে প্রকাশিত তার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ গ্রন্থ সাহিত্য একাডেমি পুরস্কার লাভ করে।
১৯৫৪ সালের ১৪ অক্টোবর কলকাতার বালিগঞ্জ এলাকায় ট্রাম দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরবর্তীতে শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২২ অক্টোবর রাত ১১টা ৩৫ মিনিটে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সময়ের প্রবাহে বহু বছর পেরিয়ে গেলেও জীবনানন্দ দাশের কবিতা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও অনুরণিত। তার জন্মদিনে বরিশালজুড়ে আয়োজিত নানা কর্মসূচিই প্রমাণ করে—রূপসী বাংলার এই কবি আজও বাঙালির হৃদয়ে অম্লান।

