প্রতিযোগিতা, স্বচ্ছতা ও জনস্বার্থ: নগদ প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন

আপডেট : ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৭:০০

মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) আজ শুধু অর্থ লেনদেনের মাধ্যম নহে। বরং ইহা গ্রামীণ অর্থনীতি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা ও প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশে পরিণত হইয়াছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসিয়াছে-লাভজনক ও জনপ্রিয় এমএফএস প্রতিষ্ঠান 'নগদ' যদি বিক্রয় করা হয়, তাহা কি সত্যই সাধারণ মানুষের জন্য সুফল বহিয়া আনিবে? অর্থনীতির মৌলিক নীতিই বলিয়া দেয়, প্রতিযোগিতা থাকিলে বাজারে সেবার মান বৃদ্ধি পায় এবং ব্যয় হ্রাস পায়। বাংলাদেশের এমএফএস খাতে দীর্ঘদিন ধরিয়া একটি শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের আধিপত্য থাকিলেও 'নগদ'-এর আবির্ভাব সেই ভারসাম্যে পরিবর্তন আনিয়াছিল। বিশেষত, ক্যাশ আউট চার্জ তুলনামূলক কম রাখিবার মাধ্যমে ‘নগদ’ বাজারে একধরনের মূল্য প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করিয়াছে, যাহার প্রত্যক্ষ সুফল পাইয়াছে সাধারণ ব্যবহারকারী। অতএব, এই প্রতিষ্ঠানের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণের প্রশ্নটি শুধু ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত নহে, বরং জনস্বার্থের সহিত নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট।

সাম্প্রতিক পত্রিকান্তরে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন হইতে জানা যায়, ‘নগদ’-এর মালিকানা ও ব্যবস্থাপনা পুনর্গঠনের উদ্যোগ চলিতেছে। আদালতের স্থগিতাদেশ, মালিকানা সংক্রান্ত জটিলতা এবং সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ-সমস্ত বিষয় মিলাইয়া একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। এই জটিলতা নূতন কিছু নহে, বরং রাষ্ট্রীয় ও বেসরকারি অংশীদারিত্বে গঠিত অনেক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেই এমন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়; কিন্তু এইখানে মূল বিবেচ্য হওয়া উচিত-এই ধরনের পদক্ষেপ কি বাজারে প্রতিযোগিতা কমাইয়া দিবে? যে কোনো দেশের জন্য অ্যান্টি-মনোপলি বা একচেটিয়া প্রবণতা প্রতিরোধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একচেটিয়া বাজারে গ্রাহকের বিকল্প কম থাকে, ফলে সেবার মান কিংবা মূল্য নির্ধারণে ভোক্তার স্বার্থ উপেক্ষিত হইবার আশঙ্কা বাড়ে। বিপরীতে, প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে উদ্ভাবনী, দক্ষ ও গ্রাহকবান্ধব হইতে বাধ্য করে। ‘নগদ’-এর উপস্থিতি যদি এমএফএস খাতে এই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখিতে সহায়ক হয়, তবে তাহার ভবিষ্যৎ লইয়া যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে এই বাস্তবতা গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

তবে অন্যদিকে স্বচ্ছতা, আইনগত বৈধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলার প্রশ্নও অবহেলা করা যায় না। মালিকানা লইয়া যদি অস্পষ্টতা থাকে কিংবা আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন থাকে, তাহা হইলে তাড়াহুড়া করিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ ভবিষ্যতে আরও জটিলতার জন্ম দিতে পারে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করিবার জন্য যেমন সুস্পষ্ট আইনি কাঠামো প্রয়োজন, তেমনি জনগণের আস্থা রক্ষার জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ প্রক্রিয়া ও জবাবদিহি। ফরেনসিক অডিট, ডিউ ডিলিজেন্স কিংবা আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা-এই সকল উদ্যোগ সত্যিকার অর্থে প্রাতিষ্ঠানিক শুদ্ধতার লক্ষ্যে গ্রহণ করা আবশ্যক। এইখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হইল-রাষ্ট্রের ভূমিকা। রাষ্ট্র কখনো নিয়ন্ত্রক, কখনো অংশীদার, আবার কখনো সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর রক্ষক। এই তিন ভূমিকাকে ভারসাম্যে রাখিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাই চ্যালেঞ্জ। কারণ রাষ্ট্রীয় নীতির সামান্য পরিবর্তনও বৃহৎ আর্থিক ব্যবস্থায় সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলিতে পারে। এমএফএস খাত যেহেতু কোটি মানুষের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সহিত যুক্ত, সেইহেতু যে কোনো রূপান্তর যেন হঠাৎ ধাক্কা সৃষ্টি না করে, সেই সতর্কতা অপরিহার্য।

প্রশ্ন উঠিতে পারে-নূতন মালিকানা কি উন্নত প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সেবাকে আরও শক্তিশালী করিতে পারিবে? তখনই পারিবে, যদি প্রক্রিয়াটি সুস্পষ্ট ও প্রতিযোগিতামূলক হয়। আবার বিপরীত সম্ভাবনাও উড়াইয়া দেওয়া যায় না। যদি মালিকানা পরিবর্তনের ফলে বাজারে প্রতিযোগিতা কমে, তাহা হইলে দীর্ঘ মেয়াদে গ্রাহকই ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারেন। সুতরাং মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি কাঠামো নির্মাণ করা, যাহাতে বিনিয়োগ আসে; কিন্তু প্রতিযোগিতার পরিবেশ ক্ষুণ্ণ না হয়। মূলত ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নির্ভর করে আস্থার উপর-ব্যবহারকারীর আস্থা, বিনিয়োগকারীর আস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের বিচক্ষণতার উপর। ‘নগদ’-এর প্রসঙ্গ তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের গল্প নহে, বরং বাংলাদেশের ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ রূপকল্পের অংশ। সিদ্ধান্ত যাহাই হউক, তাহা যেন জনস্বার্থ এবং বাজারের স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতার ভারসাম্য রক্ষা করিয়া নেওয়া হয়।

ইত্তেফাক/এমএস