শুধু চাউলে কি আর চলে?

মধ্যরাত থেকে চাঁদপুরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, জেলেদের দীর্ঘশ্বাস

আপডেট : ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:২০

“শুধু চাউলে কি আর চলে? পোলাপাইনের লেহাপড়া, ঋণের কিস্তি—সব মিলাইয়া সংসার। গাঙে মাছ ধরতেই যদি না পারি, চলমু কেমনে?” কথাগুলো বলছিলেন চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল এলাকার জেলে ফুলচান বর্মন। পাশে দাঁড়িয়ে সায় দেন কালিচাঁদ বর্মন, গোপাল চন্দ্র ও যোগেন্দ্র লাল। সামনে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা—আর সেই ভাবনাতেই যেন শুকিয়ে গেছে তাদের মুখ।

শুক্রবার মধ্যরাত থেকে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে আমিরাবাদ বাজার পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার এবং হাইমচরের চরভেরবী পর্যন্ত প্রায় ৭০ কিলোমিটার এলাকা ইলিশের অভয়াশ্রম হিসেবে কার্যকর হচ্ছে। এ সময় পদ্মা-মেঘনায় সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকবে। পাশাপাশি মাছ আহরণ, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও মজুদও বন্ধ থাকবে। বরফকলগুলোও থাকবে বন্ধ।

সরকার জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাস নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবে এই সিদ্ধান্তে পদ্মা-মেঘনাপাড়ের হাজারো জেলে পরিবারে নেমে এসেছে হতাশার ছায়া।

উপজেলা মৎস্য অফিস সূত্রে জানা গেছে, মতলব উত্তরে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৯ হাজার ১০০। ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত দুই মাস নদীতে জাল ফেলা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।

জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ে সরকার যে খাদ্য সহায়তা দেয়, তা সব জেলে পান না। অনেক সময় চাহিদার তুলনায় কম চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় পরিবার-পরিজন নিয়ে কষ্টে দিন কাটাতে হয় তাদের।

সরেজমিনে কথা বলে জানা যায়, চলতি মৌসুমেও আশানুরূপ ইলিশ ধরা পড়ছে না। প্রতিদিন হাজারো জেলে নদীতে গেলেও অনেক সময় খালি জাল টেনে ফিরতে হচ্ছে। যেসব নৌকায় অল্প কিছু ইলিশ মিলছে, তা দিয়ে শ্রমিকের মজুরি ও জ্বালানি খরচই ওঠে না।

দশানী এলাকার জেলে খোরশেদ বলেন, “কিস্তির বোঝা মাথায় নিয়ে নদীতে নামি। কিন্তু মাছ নাই। ভরা মৌসুমেও যদি এই অবস্থা হয়, নিষেধাজ্ঞার দুই মাস কেমনে কাটামু?”
জেলেদের দাবি, জাটকা ধরা ও অবৈধ জাল ব্যবহারের কারণে নদীতে ইলিশের সংখ্যা কমছে। এর প্রভাব পড়ছে তাদের জীবিকায়।

নিষেধাজ্ঞার প্রভাব পড়বে শুধু জেলেদের ওপরই নয়। আড়তদার, মাছ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাজারের বিক্রেতারাও ক্ষতির মুখে পড়বেন বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাজারে সরবরাহ কম থাকায় ইতিমধ্যে ইলিশের দাম বাড়তে শুরু করেছে।

এ বিষয়ে মতলব উত্তরের সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা বিজয় কুমার দাস বলেন, ডুবোচর, প্রতিকূল আবহাওয়া, অতিরিক্ত মাছ শিকার ও পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে ইলিশের প্রজনন ও মজুদে প্রভাব পড়তে পারে। মা ইলিশ রক্ষায় সরকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই এ নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

নদীপাড়ের জেলেরা অবশ্য বলছেন, “ইলিশ বাঁচুক, আমরাও বাঁচতে চাই।” দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা—তাদের কাছে তাই শুধু নিয়ম নয়, বেঁচে থাকার লড়াই।

ইত্তেফাক/এএইচপি